শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
আগামীকাল ২৩শে জানুয়ারি গোটা দেশ জুড়েই সারম্বরে পালিত হবে,১২৯তম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকী। এই বছর আবার,স্বরস্বতী পুজোয় একদিনে পড়েছে।জানেন কি স্বরস্বতী পুজো নিয়েও জেলে বসে এক বৈপ্লবিক কান্ড ঘটিয়েছিলেন।আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে স্বরস্বতী পুজোর এক অজানা কাহিনী তুলে ধরল বঙ্গবার্তা। একই দিনে পড়েছে।জানেন কি স্বরস্বতী পুজো নিয়েও জেলে বসে এক বৈপ্লবিক কান্ড ঘটিয়েছিলেন।আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে স্বরস্বতী পুজোর এক অজানা কাহিনী তুলে ধরল বঙ্গবার্তা।
মন্দালয়ের জেলে সরস্বতী পুজোর ভাবনা
১৯২৪ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন সুভাষচন্দ্র বসুকে গ্রেফতার করে বার্মার মান্দালয় জেলে পাঠিয়েছিল,তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল এই তরুণ নেতার মনোবল ভেঙে দেওয়া।কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে,সুভাষচন্দ্র কেবল একজন রাজনৈতিক যোদ্ধা নন,বরং এক গভীর আদর্শবাদী মানুষ।১৯২৬ সালের শুরুতেই জেলে সরস্বতী পুজোর আয়োজন নিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।সুভাষচন্দ্র এবং তাঁর সহবন্দীরা সিদ্ধান্ত নেন যে,কারাগারের ভেতর তাঁরা মর্যাদার সাথে বিদ্যার দেবীর আরাধনা করবেন।
২১ দিনের দীর্ঘ অনশন
এই পুজোর জন্য বন্দিরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ বরাদ্দ দাবি করেন।কিন্তু তৎকালীন জেল কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য অর্থ দিতে বা জেলের ভেতর ঘটা করে পুজোর অনুমতি দিতে অস্বীকার করে।এই প্রত্যাখ্যানকে সুভাষচন্দ্র তাঁর মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন।জেল সুপারিনটেনডেন্টের সাথে দীর্ঘ বাদানুবাদের পর যখন কোনো সমাধান হলো না,তখন তিনি অনশনের পথ বেছে নেন।জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে শুরু হয় এক দীর্ঘ লড়াই।যা টানা ২১ দিন ধরে চলেছিল।
আরও পড়ুনঃ জারি হয়ে গেল নির্দেশ; জমায়েত-মিছিল করা যাবে না কলেজ স্ট্রিটে
ব্রিটিশ সরকারের নতি স্বীকার
অনশনের ফলে সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে,কিন্তু তাঁর জেদ ছিল অটল।শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় জনমতের চাপে এবং জেলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা এড়াতে পিছু হটতে বাধ্য হয়।ব্রিটিশ সরকার পুজোর খরচ বাবদ অর্থ বরাদ্দ করে এবং জেলের প্রাঙ্গণে পুজোর অনুমতি দেয়।সেই জয় কেবল একটি পুজোর অনুমতি ছিল না,বরং তা ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক নৈতিক বিজয়।পুজোর দিন নেতাজি নিজে উপবাস থেকে নিষ্ঠার সাথে অঞ্জলি দেন এবং কয়েদিদের সাথে নিয়ে প্রসাদ বিতরণ করেন।
সরকারি দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল,পুজোর পরবর্তী পর্যায়।ব্রিটিশ সরকার পুজোর অনুমতি দিলেও,পরবর্তীতে সেই খরচের টাকা বন্দিদের ব্যক্তিগত ভাতার থেকে কেটে নেওয়ার চেষ্টা করে।সুভাষচন্দ্র এই হীনমন্যতার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান।তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে,”ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব এবং এর জন্য বন্দিদের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”তাঁর এই আপসহীন মনোভাবের কাছে ব্রিটিশরা পুনরায় হার মানতে বাধ্য হয়।যা জেল কোড বা কারা আইনে ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক নজির হয়ে থাকে।
এই ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব আজও অপরিসীম।কারণ,এটি প্রমাণ করে যে,নেতাজির কাছে আধ্যাত্মিকতা এবং দেশপ্রেম ছিল সমার্থক। কারাগারের সেই সরস্বতী পুজো বিপ্লবীদের মনে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করেছিল।নিজের মা প্রভাবতী দেবীকে লেখা চিঠিতেও তিনি এই পুজোর আনন্দের কথা উল্লেখ করেছিলেন।মান্দালয় জেলের সেই বসন্ত পঞ্চমীর উৎসব আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে,বন্দি অবস্থাতেও মানুষের অন্তরের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে ব্রিটিশদের মতো কোনো পরাক্রমশালী শক্তিও স্তব্ধ করতে পারেনি।









