পরমাণু যুগের সবচেয়ে ভীতিকর প্রশ্ন—সংকট মুহূর্তে কোন দেশ প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের ট্রিগারে চাপ দেবে? সম্প্রতি ইউটিউবার রাজ শামানির পডকাস্টে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জিয়াং শুয়েকিন (Jiang Xueqin) এই প্রসঙ্গের এক তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।
আরও পড়ুনঃ 2026 – 1947 = 79; ২০২৬-এর স্বাধীনতা দিবস ৭৯ নাকি ৮০তম?
১. অধ্যাপক জিয়াং শুয়েকিনের মূল বক্তব্য ও পূর্বাভাস
-
জীবদ্দশায় পরমাণু যুদ্ধের অতি-নগণ্য সম্ভাবনা: জিয়াং মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে এক ধরনের সার্বজনীন মানসিক নিষেধাজ্ঞা ও সর্বসম্মত বাধা রয়েছে। ফলে তাঁর জীবদ্দশায় পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য শতাংশ।
-
যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে প্রথম আঘাতকারী পাকিস্তান: যদি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতিতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহৃত হয়, তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকেই তা প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
-
অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা ও অস্থিরতা: জিয়াংয়ের মতে, পাকিস্তানের এই প্রবণতা তাদের আক্রমণাত্মক শক্তির চেয়ে বরং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল। এক সংকটময় মুহূর্তে নিজেদের সংযত রাখার মতো মজবুত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সেখানে অনুপস্থিত থাকতে পারে।
২. ভারত ও পাকিস্তানের ‘পারমাণবিক নীতি’ (Nuclear Doctrines)-র পার্থক্য
জিয়াং তাঁর বিশ্লেষণের পেছনে দুই দেশের পারমাণবিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্যকে তুলে ধরেছেন:
| ক্ষেত্র | ভারতের অবস্থান | পাকিস্তানের অবস্থান |
| নীতি (Doctrine) | ‘No First Use’ (প্রথমে ব্যবহার নয়): ভারত নীতিগতভাবেই প্রতিজ্ঞা করেছে যে আগে পারমাণবিক হামলা চালাবে না। | কৌশলগত অস্পষ্টতা (No NFU): পাকিস্তান কোনো ‘প্রথমে ব্যবহার না করার’ নীতি মানেনি। |
| সামরিক সক্ষমতা | বিশাল প্রথাগত (Conventional) সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব। | প্রথাগত শক্তির দিক থেকে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে থাকায় পারমাণবিক অস্ত্রকে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার। |
| অস্ত্রের অবস্থান | SIPRI-র তথ্য অনুযায়ী ভারতের প্রায় ১৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে। | পাকিস্তানের কাছে ১৭০টি ওয়ারহেড থাকলেও তারা মোতায়েন অবস্থায় রাখেনি। |
মূল পয়েন্ট: ভারতের শক্তিশালী প্রচলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই পাকিস্তান প্রথম পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে পারে, যেখানে ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথমে এই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই।
আরও পড়ুনঃ স্বাধীনতার আনন্দ, ঐতিহাসিক নাটকীয়তা; ১৫ আগস্ট নয়, ১৮ই আগস্ট বাংলার এই জেলাগুলিতে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়
৩. পাকিস্তানি নেতৃত্বের লাগাতার হুমকি ও ভারতের অবস্থান
বিগত কয়েক বছরে এবং সম্প্রতি পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের একাধিক মন্তব্য পারমাণবিক উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে:
-
আগের পটভূমি: ২০০২ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় পারভেজ মোশাররফ এবং ২০১৯ সালে পুলওয়ামা/বালাকোটের ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পরমাণু যুদ্ধের ভয় দেখিয়েছিলেন।
-
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ: ২০২৫ সালের মে মাসে পহেলগাঁও ঘটনার প্রেক্ষিতে চালানো ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের থেকে কড়া মন্তব্য পাওয়া যায়। সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন মুলুকে মন্তব্য করেছিলেন, “অস্তিত্ব বিপন্ন মনে হলে আমরা একা যাব না, বিশ্বের অর্ধেককে সঙ্গে নিয়ে যাব।”
-
ভারতের প্রতিক্রিয়া: পাকিস্তানের এই ধরনের বক্তব্যকে সর্বদা দায়িত্বজ্ঞানহীন ‘পারমাণবিক আস্ফালন’ বলে অভিহিত করে আসছে ভারত।
উপসংহার
জিয়াং স্পষ্ট করেছেন যে পাকিস্তান এখনই কোনো পরমাণু হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। তবে যদি দুই দেশের মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধ এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন তাদের সামরিক পরিকাঠামো ‘প্রতিরোধক’ (Deterrent) নীতি ভেঙে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে।


