বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রতিবেদন:
তন্ত্রসাধনার মূলকেন্দ্র বীরভূমের তারাপীঠ মহাশ্মশান কেবল সাধনার ক্ষেত্র নয়, এটি মা তারা ও তাঁর পরম সাধক সন্তান বামাক্ষ্যাপার অজস্র অলৌকিক লীলাক্ষেত্রের রূপক। সাধক বামাক্ষ্যাপা কোনোদিন আচার-অনুষ্ঠান বা শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধের কঠোর নিয়মে বাঁধা পড়েননি। তাঁর কাছে মা তারা ছিলেন রক্তমাংসের এক জীবন্ত জন্মদাত্রী। শ্রীশ্রী কৌশিকী অমাবস্যা ও বিভিন্ন ধর্মীয় তিথিতে তাঁর জীবনের অজস্র জনশ্রুতি ভক্তদের মুখে মুখে ফেরে, যার মধ্যে অন্যতম প্রলয়ংকর ঝড়-বৃষ্টি থামিয়ে মায়ের ভোগ নিবেদনের এই রোমহর্ষক লোকগাথা।
তারাপীঠের প্রাচীন রূপ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়
আজকের মার্বেল পাথরে মোড়া সুরম্য তারাপীঠ মন্দির প্রাচীনকালে এমন ছিল না। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এটি ছিল মাটির দেওয়ালে নির্মিত খড়ের চালার এক সাধারণ দেবস্থান:
| পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট | বিপত্তির বিবরণ |
| উৎসবের দিন ও বিপর্যয় | তারাপীঠের এক বিশেষ উৎসবের দিন হঠাৎ উত্তর-পশ্চিম কোণে ঘন কালো মেঘ জমে কালবৈশাখীর রূপ নেয়। সাঁ সাঁ হাওয়ায় প্রদীপ নিভে যায়, শ্মশান চত্বরে অন্ধকার নেমে আসে। |
| ভোগ অর্পণে বাধা | মন্দিরের নড়বড়ে খড়ের চালা দিয়ে সোজাসুজি জল পড়তে শুরু করায় মাটির মেঝে কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। ফলে সেবায়েত ও পুরোহিতদের পক্ষে মায়ের সামনে ভোগ সাজানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। |
| সেবায়েতদের ব্যাকুলতা | “মা কি আজ উপোস থাকবেন?”—এই আশঙ্কায় মন্দিরের সেবায়েত ও ভক্তদের মধ্যে হাহাকার পড়ে যায়। |
আরও পড়ুনঃ জগদ্ধাত্রীর শহরে প্যারিসের ছোঁয়া! জগদ্ধাত্রী পুজোর আগেই সাজসাজ রব চন্দননগরে
সন্তানের গর্জন ও প্রকৃতির ওপর অলৌকিক প্রভাব
শ্মশানের এক গাছের তলায় ধুনোর পাশে বসা বামাক্ষ্যাপা যখন পুরোহিতদের এই আকুলতা ও নিজের মায়ের না-খেতে পাওয়ার কারণ বুঝতে পারেন, তখন শান্ত ক্ষ্যাপা বাবা রুদ্র রূপ ধারণ করেন:
-
আকাশপানে হাঁক: কাদা-জল ভেঙে উন্মুক্ত প্রান্তরে এসে দুই হাত তুলে আকাশপানে পরম শক্তিতে হুংকার ছাড়েন—“জয় তারা! জয় তারা!”
-
ঝড়-বৃষ্টি স্তব্ধ হওয়া: জনশ্রুতি অনুযায়ী, সন্তানরূপী সাধকের সেই ডাফের প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যে তীব্র ঝোড়ো হাওয়া থমকে যায়। চারপাশের গ্রামে মুষলধারে বৃষ্টি পড়লেও অদৃশ্য ছাতার মতো তারাপীঠ মন্দিরের চালার ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
-
মেঘের প্রতি কড়া নির্দেশ: লোকমুখে প্রচলিত, বামাক্ষ্যাপা আকাশের দিকে তাকিয়ে আদেশ দিয়েছিলেন—“যতক্ষণ না আমার মা পেটভরে খাচ্ছেন, ততক্ষণ তুই এক ফোঁটা জলও নিচে ফেলবি না!”
ভোগ নিবেদন ও আধ্যাত্মিক বার্তা
বামাক্ষ্যাপার আদেশে দুর্যোগ সাময়িকভাবে থমকে গেলে সেবায়েতরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। পুনরায় প্রদীপ জ্বালিয়ে, শাঁখ ও ঢাকের বাদ্যে গরম খিচুড়ি ভোগ মাকে নিবেদন করে আরতি সম্পন্ন করা হয়।
মায়ের ভোগ অর্পণ শেষ হওয়া মাত্রই বামাক্ষ্যাপা শান্ত হয়ে শ্মশানের আসনে ফিরে যান। আর তিনি আসন গ্রহণ করতেই পুনরায় আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আসে তারাপীঠে। যুক্তিবাদীদের কাছে এটি আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন বলে মনে হলেও, তারাপীঠের ভক্তদের কাছে এটি মা ও সন্তানের চিরন্তন আত্মিক টান এবং ভক্তির জোরে প্রকৃতির রুদ্ররূপকে জয় করার এক ঐতিহাসিক বিশ্বাস।


