শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাক্ষেত্র নবদ্বীপে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন ধর্মীয় ইতিহাস। আর সেই ঐতিহ্য ও ভক্তির অন্যতম কেন্দ্রস্থল হলো নেতাজি সুভাষ রোডের ‘অভয়া মা-তলা’। শারদোৎসবের আবহ তৈরি হতেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা নবদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী ‘মা অভয়া’র মন্দিরে পুণ্যার্থীদের ঢল নামতে শুরু করেছে। সন্তানহীন দ্বিভুজা রূপের এই ব্যতিক্রমী দেবী দুর্গার চরণে প্রতি বছর মহাঅষ্টমীর দিনে প্রায় ২৫ হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে।
নবদ্বীপের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী পূর্ব বর্ধমান ও রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগুনতি মানুষের কাছে এই মন্দির আজও এক পরম জাগ্রত পীঠস্থান।
আরও পড়ুনঃ উজ্জয়িনীতে ‘অলৌকিক’ কাণ্ড! মন্দির ধসে পড়লেও নড়ানো যাচ্ছে না বজরংবলীকে
মূর্তির অলৌকিক উদ্ধার ও দেবীর বিরল রূপকথা
ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানা যায়, ১৭৫০ সাল নাগাদ নবদ্বীপের এই স্থানে মাটি খনন করার সময় একটি অতিক্ষুদ্র ধাতব দেবীমূর্তি উদ্ধার হয় (দৈর্ঘ্য মাত্র ৭ সেমি এবং প্রস্থ ৩.৫ সেমি)। তৎকালীন সমাজপতিদের নির্দেশে উদ্ধার হওয়া সেই ছোট্ট ধাতব মূর্তির আদলেই মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণের বিধান দেওয়া হয়।
| মূর্তির বৈশিষ্ট্য | পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা |
| দ্বিভুজা রূপ ও রহস্যময় অংশ | দেবী এখানে দ্বিভুজা (দুই হাত বিশিষ্ট)। ডান হাতটি অভয় বা বরাভয় মুদ্রায় এবং বাঁ হাতে রয়েছে একটি রহস্যময় ভগ্নাংশ। |
| মহাদেবের বালক রূপ | দেবীর সঙ্গে কোনো সন্তান-সন্ততি নেই; বদলে রয়েছেন এক শিশুবালক। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী ভগবতীর দীর্ঘ ধ্যান ভঙ্গ করতে মহাদেব স্বয়ং বালক রূপ ধরে আসেন এবং দেবী তাঁকে বাঁ হাতে আগলে রাখেন। |
| পাদদেশের সরীসৃপ | দেবীর চরণতলে রয়েছে একটি রহস্যময় সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর আকৃতি—যাকে ইতিহাসবিদ ও গবেষকেরা ‘গোধিকা’ (গোসাপ) বলে মনে করেছেন। |
আরও পড়ুনঃ ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’; ওপরে কোলাকুলি, নিচে ‘খুনো-খুনি’! বাংলার নতুন ‘রাজনৈতিক সৌজন্য’?
অষ্টমীর রাত দুটো থেকে ভক্তের লাইন ও হেরিটেজ স্বীকৃতি
নবদ্বীপের এই প্রাচীন অভয়া মাতার মন্দিরটি ইতিমধ্যেই রাজ্য হেরিটেজ (Heritage) স্বীকৃতি লাভ করেছে। সময়ের সাথে সাথে নবদ্বীপের জীবনযাত্রা ও উৎসবের আঙ্গিক বদলালেও মায়ের পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।
দেবীর সেবায়েতদের মতে, মহাঅষ্টমীর দিন রাত দুটো থেকেই মন্দিরে পুণ্যার্থীদের দীর্ঘ লাইন পড়ে। মনের বাসনা পূরণ ও দেবীর কৃপা লাভের আশায় হাজার হাজার ভক্ত অভয়া মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেন। আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় পার করে আজও নবদ্বীপের বুকে অমলিন ভক্তি ও ঐতিহ্যের এই ‘অভয়া মা-তলা’।



