বিশেষ ফিচার ও সংস্কৃতি-বিশ্লেষণ:
শারদোৎসবের দিনগুলিতে বাঙালির ঘরে ঘরে ও মণ্ডপে মণ্ডপে একটি চিরন্তনী প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—”ধর্মীয় উৎসবে ও মায়ের পূজায় বাঙালি কেন আমিষ পদ গ্রহণ করে?” যেখানে ভারতের বহু অঞ্চলে দুর্গাপূজা বা নবরাত্রির সময় সম্পূর্ণ নিরামিষাশী থাকার প্রথা রয়েছে, সেখানে বাংলায় চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে, বাংলায় শক্তির উপাসনা কেবল শাস্ত্রীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; এখানে জগজ্জননী দেবী দুর্গা বা শ্যামা মা কেবল পুরাণের দেবী নন, তিনি বাঙালির ঘরের মেয়ে ‘উমা’। নদীমাতৃক বঙ্গদেশের খাদ্যসংস্কৃতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং শতাব্দীর প্রাচীন শাক্ত ঐতিহ্যের এক অপূর্ব বহিপ্রকাশ দেখা যায় এই আমিষ ভোগের সংস্কৃতিতে।
আরও পড়ুনঃ সিঁদুরে মেঘে আশঙ্কিত শিক্ষকদের একাংশ! জনগণনার কাজে যুক্ত শিক্ষকদের বদলি নয়
শাক্তপীঠ ও বনেদি বাড়ির আমিষ ভোগের বৈচিত্র্য
বাংলার শতবর্ষী প্রাচীন শাক্তপীঠ ও প্রখ্যাত বনেদি বাড়িগুলিতে দেবীকে নিবেদিত আমিষ পদের বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর:
আমিষ ভোগ কেন ‘নিরামিষ মহাপ্রসাদ’?
বাঙালির নিত্যদিনের রান্নার সাথে দেবীর ভোগ রন্ধনশৈলীর সূক্ষ্ম তফাত রয়েছে। শাক্ত শাস্ত্রে বলিকৃত পাঁঠার মাংস কিংবা ভোগে ব্যবহৃত মাছকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চালধোয়া জল, আদা, লঙ্কা, জিরে ও গরম মশলা দিয়ে পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই প্রস্তুত করা হয়। শাস্ত্রীয় পরিভাষায় এই বিশেষ রন্ধনপ্রণালীর পর সেই খাদ্য আর সাধারণ আমিষ থাকে না, তা রূপান্তরিত হয় ‘নিরামিষ মৎস্য’ বা ‘মহাপ্রসাদে’।
আরও পড়ুনঃ আয়ু ৭ বছর, খুলল চিকিৎসার নতুন দিশা; গবেষণাগারে কৃত্রিম মগজ বানিয়ে যুগান্তকারী সাফল্য
নদীমাতৃক বাংলা, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ ও শাক্ত সংস্কৃতি
১. ভৌগোলিক ও খাদ্যগত সত্য: প্রাচীনকাল থেকেই নদীমাতৃক বাংলায় মাছ ছিল প্রধান ও সহজলভ্য খাদ্য। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র সেই আত্মিক পরিচয়ই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁদের উপাস্যে। বাঙালি সাধকরা নিজেরা যা খেতেন, ভালোবেসে মাকেও সেই আহারই অর্পণ করেছেন।
২. প্রাচীনতা বনাম আধুনিকতা: বাংলায় যেসব কালী বা দুর্গা মন্দির ১০০, ২০০ বা ৩০০ বছরের পুরোনো, তার অধিকাংশেই আমিষ বা মাছ ভোগের প্রাচীন রীতিনীতি বিদ্যমান। পরবর্তীতে গড়ে ওঠা কিছু নবীন মন্দিরে নিরামিষ ভোগের প্রচলন দেখা গেলেও মূল শাক্ত ঐতিহ্য কিন্তু পিওর ‘নন-ভেজিটেরিয়ান’ আবেগকেই বহন করে।
৩. ঘরের মেয়ের আগমনী: বাঙালির কাছে দেবী দুর্গা কোনো দূরবর্তী পরমেশ্বরী মাত্র নন; তিনি কন্যা রূপী উমা, যিনি বছরে একবার বাপের বাড়িতে আগমন করেন। তাই বাপের বাড়িতে আদরের মেয়েকে মাছ-মাংস খাইয়ে আদর জানানোর এই বঙ্গীয় ব্যাকুলতাই বাঙালির পুজোর প্রধান ভিত্তি।
তথ্যসূত্র
অনাথকৃষ্ণ দেব রচিত ‘দুর্গাপূজার বলি ও জীব-বলি’, ‘কালিকা পুরাণ’ (বলিদান-বিধি অধ্যায়), শ্রীশ্রীকালী পূজা পদ্ধতি (শ্যামাচরণ সাংখ্যতীর্থ), ‘বাংলার শাক্ত সংস্কৃতি’ (স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ), ‘কালী-কথা’ (তমঘ্ন নস্কর) এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক নথিপত্র।


