কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
কুমোরটুলির গলির মধ্যে দুপুরবেলা হঠাৎ হইচই। কেউ শাড়ি পরে ধুনুচি নাচছেন, কেউ আবার মাটির প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে রিল বানাচ্ছেন। কেউ আবার অসুরের পা ধরে ফোটোশুট করছেন। প্রায় প্রতিদিন রিং লাইট, ট্রাইপড ফোন, ক্যামেরা নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে রিল বানানো, ছবি তোলার দল। শুধু যে নিজেদের ছবি তুলছেন তাই নয়, সঙ্গে মৃৎশিল্পীদের উদ্দেশেও বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘কাকু একটু হেসে তাকান’, ‘মায়ের চোখে তুলি রাখুন’। আর তাতেই খট করে একটা শব্দ, সিংহের লেজ খানিকটা ভেঙে গেল। মৃৎশিল্পী তখন ব্রাশ নামিয়ে বললেন, ‘এইসব আর হবে না। আমাদের কাজের গতি নষ্ট হচ্ছে, মূর্তি ভাঙছে। আমরা তো কোনও শুটিং সেট নই।’ প্রতিদিন রিল, ফোটোশুটের দাপট থেকে বাঁচতে রীতিমতো রেট বোর্ড দরজায় সেঁটে দিলেন নিলু পালের মতো মৃৎশিল্পীরা।
মৃৎশিল্পীরা অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে ঝুলিয়ে দিয়েছেন রেট চার্ট। এবার থেকে ছবি তুলতে গেলে গুনতে হবে টাকা। ভিডিও বা রিল শুটের জন্য খসবে কড়ি। ঘাম ঝরিয়ে গড়া মূর্তির সামনে সবাই বিনা ভাড়ায় স্টুডিও বানিয়ে নিচ্ছিলেন, হাসতে হাসতে ঠিক এই কথাই বললেন রতন পাল। তিনি আরও বলেন, ‘ওরা যেমন কনটেন্ট বানিয়ে আয় করে, আমরাও তেমন একটু আয় করব। তবে টাকার কথা শুনে বেশিরভাগই ভেগে যাচ্ছে।’
আরও পড়ুনঃ ‘দি-পু-দা’ থেকে কি ‘দা’ ক্ষয়িষ্ণু? বাঙালি কি মুখ ফেরাচ্ছে দার্জিলিংয়ের থেকে!
কুমোরপাড়ায় নিলু পালের কারখানার বাইরে ঝোলানো একটি বোর্ড। তাতে লেখা, ‘ফোটো ১০০, ভিডিও ৫০০’। বিষয়টি কী তা জানতে ভেতরে ঢুকতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘ফ্রিতে কোনও ভিডিও, ফোটো তোলা যাবে না, রেট চার্ট দেখে ঢুকুন।’
এমন পদক্ষেপ কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য একরাশ ক্ষোভই উগরে দিলেন। একটা মূর্তি দেখিয়ে বললেন, ‘এই মূর্তিটা একটা ক্লাবের জন্য বানাচ্ছিলাম। ভিডিও করার সময় দেখি, হাতটা ভেঙে দিয়েছে। আর যখন-তখন কাজের মাঝে এসে এসব করা শুরু করছে। আমাদেরও তাতে জোর করে অংশগ্রহণ করিয়ে নিচ্ছে। নিজেদের লোকসান তো আর করা যাবে না। তাই এই বোর্ড ঝুলিয়ে দিলাম।’
এই রেট চার্ট অবশ্য ১৫ মিনিটের জন্য। ১৫ মিনিটের বেশি সময় লাগলে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও টাকার কথা শুনে বেশিরভাগই ফিরে যাচ্ছেন বলে জানাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। কেউ আবার ফোন নামিয়ে মানিব্যাগ খুঁজছেন। কেউ আবার বলছেন, ‘কাকু শুধু একটা ৩০ সেকেন্ডের রিল বানানোর এত দাম।’
আরও পড়ুনঃ জীববিদ্যার প্রশ্নে ভুল, উচ্চ মাধ্যমিকের শেষ দিনে বিপত্তি; জানাল সংসদ
দরকষাকষির পালাও চলছে।
পুজোর আগে অনেকেই দুর্গা সেজে আবার অনেকে কুমোরটুলির অ্যাসথেটিক বিষয়টিকে তুলে ধরে ফোটো, ভিডিও করেন। শুক্রবার নিজের মেয়েকে সুন্দর লালপাড়ের সাদা শাড়ি, হাতে ত্রিশূল দিয়ে ফোটোশুটের জন্য নিয়ে এসেছিলেন তানিয়া সাহা। তবে এখানে এসে রেট চার্ট দেখে চক্ষু চড়কগাছ। গতবছরও এসেছিলেন। তবে এমনটা দেখেননি। এবার দেখে কিছুটা অবাক হয়েই বললেন, ‘এর আগেও ফোটো তুলতে এসেছিলাম। এমন কিছু দেখিনি। যাই হোক, এমনি রাস্তাতেই ফোটো তুলে চলে যাব।’ মৃৎশিল্পী নারায়ণ পাল মজার ছলে বললেন, ‘নতুন এই ফন্দিতে এই রিল, ফোটো তোলার দলকে বাগে আনা গিয়েছে। না হলে রাত, দুপুর নেই, যখন-তখন এসে কাজের ভিডিও, ফোটো তোলা, হাজারটা প্রশ্ন করে। মূর্তির ক্ষয়ক্ষতিও হয়।’







