শুভজিৎ মিত্র,কলকাতা, বঙ্গবার্তা,নিউজ ডেস্কঃ
১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি। কাশীপুর উদ্যানবাটির সেই পড়ন্ত বিকেলে মুমূর্ষু শরীরের গণ্ডি ছাড়িয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হয়ে উঠেছিলেন ‘কল্পতরু’। উপস্থিত ভক্তদের উদ্দেশ্যে তাঁর সেই অমোঘ অভয়বাণী ছিল— “তোমাদের চৈতন্য হোক।” আজ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়ে, প্রায় দেড়শ বছর অতিক্রম করার পর, বাঙালির সমাজ-মানসে সেই ‘চৈতন্য’-এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু? আমরা কি কেবল উৎসবের হুজুগে শামিল হয়েছি, নাকি সত্যিই আমাদের চেতনার কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে? বর্তমান অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি এক গভীর আত্মোপলব্ধির প্রশ্ন।আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে বঙ্গবার্তা সেই প্রশ্নেই আলোকপাত করার চেষ্টা করল।
আরও পরুনঃ ভক্তের ঢল উত্তর থেকে দক্ষিণ, কল্পতরু উৎসবে মাতল শহরবাসী
উৎসবের আতিশয্য বনাম আদর্শের বিচ্যুতি
প্রতি বছর ১ জানুয়ারি দক্ষিণেশ্বর থেকে কাশীপুর— জনসমুদ্রে প্লাবিত হয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ভিড় যতটা না আধ্যাত্মিক আকুলতার, তার চেয়ে বেশি ‘রিল’ বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের উন্মাদনা। শ্রীরামকৃষ্ণ চেয়েছিলেন মানুষের বিবেক জাগ্রত হোক।
কিন্তু আজকের বাঙালি সমাজে বিবেক যেন কেবল ফেসবুকের কমেন্ট বক্সেই সীমাবদ্ধ। মন্দিরের বাইরে বেরিয়েই যখন আমরা সামান্য স্বার্থে অন্যের ক্ষতি করতে দ্বিধা করি না, তখন প্রশ্ন ওঠে— সেই চৈতন্যের স্পর্শ কি আমাদের হৃদয়ে লেগেছে?
ধর্মতত্ত্ব বনাম বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়
শ্রীরামকৃষ্ণের মূল শিক্ষা ছিল ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’। বর্তমান বঙ্গসমাজে আমরা জীবের সেবা করার চেয়ে তাকে বিচার করতে এবং ঘৃণা করতে বেশি ব্যস্ত। ‘যত মত তত পথ’-এর দেশে আজ ভিন্নমতের জন্য মানুষকে হেনস্থা হতে হচ্ছে।

বাঙালি এক সময় তার বৌদ্ধিক শ্রেষ্ঠত্বের জন্য গর্বিত ছিল। আজ সেই মেধা ও মনন কি কেবল ভোগবাদের চাকচিক্যের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে? এছাড়াও,দুর্নীতির ব্যাপকতা এবং প্রবীণদের প্রতি অবহেলা প্রমাণ করে যে,সামাজিক চৈতন্যের জায়গাটা সংকীর্ণ হয়ে আসছে।
যান্ত্রিক সভ্যতা ও চৈতন্যের লড়াই
একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বাঙালি আজ ডিজিটাল নাগরিক।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে মানুষের ‘বোধ’ বা ‘সহজাত চৈতন্য’ ক্রমশ ভোঁতা হচ্ছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন লৌকিক বিদ্যা নয়,সেই বিদ্যাই শ্রেষ্ঠ যা চৈতন্য দান করে। অথচ আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল ‘কেরিয়ার’ গড়ার কারখানায় পরিণত হয়েছে, ‘মানুষ’ গড়ার কারখানায় নয়।
আদর্শহীনতার রাজনীতি ও ক্ষমতার দম্ভ
রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের বাংলায় রাজনীতি ছিল এক সময় সেবার মাধ্যম। কিন্তু আজ তা পর্যবসিত হয়েছে কেবল পেশা এবং প্রতিপত্তি লাভের হাতিয়ারে। “তোমাদের চৈতন্য হোক” কথাটির অর্থ ছিল আত্মিক জাগরণ, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই জাগরণ ঘটেছে কেবল ব্যক্তিস্বার্থের।

দলবদল, আদর্শ বিসর্জন এবং ক্ষমতার অলিগলি দখল করার যে অন্ধ ইঁদুরদৌড় আমরা দেখছি, তা সামাজিক চৈতন্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
দুর্নীতির করাল গ্রাস ও নৈতিক পতন
কল্পতরু উৎসবে ভক্তরা ঠাকুরের কাছে আধ্যাত্মিক সম্পদ প্রার্থনা করেছিলেন। আর আজকের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘সম্পদ’ মানেই সরকারি কোষাগার লুঠ বা দুর্নীতির পাহাড়।

শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য— সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে দুর্নীতির যে চিত্র আমরা দেখছি, তা প্রমাণ করে যে শাসনব্যবস্থায় ‘বিবেক’ বা ‘চৈতন্যের’ কোনো স্থান নেই। নীতিহীন এই ব্যবস্থায় মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো আজ দয়া-দাক্ষিণ্যের বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
অসহিষ্ণুতা এবং বিভেদের প্রাবল্য
ঠাকুরের মূল মন্ত্র ছিল ‘সবার পথই সত্য’। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘ভিন্নমত’ মানেই ‘শত্রু’। রাজনীতির এই চরম মেরুকরণ বাঙালির চিরাচরিত সহনশীল সংস্কৃতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যে চৈতন্য মানুষকে এক করতে শেখায়, রাজনীতির কারবারিরা আজ সেই মানুষের মধ্যেই ধর্ম, জাতপাত আর দলের দেওয়াল তুলে দিচ্ছে।

চেতনার উদয় হওয়া দূরে থাক, আমরা যেন এক অন্ধকার মধ্যযুগীয় বিভাজনের দিকে এগিয়ে চলেছি।তা
আরও পরুনঃ পুঞ্চে জোরদার তল্লাশি! পাক ড্রোনে বিস্ফোরক, অস্ত্র, মাদক-বর্ষণ
রাজনীতির ‘চৈতন্য’ কি ফিরবে?
রাজনীতি সমাজের দর্পণ। সমাজ যদি চৈতন্যহীন হয়, তবে তার প্রতিফলন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পড়তে বাধ্য। তবে আশার কথা এই যে, ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিকালে মানুষই রুখে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন নিজের অধিকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে ওঠে, তখনই প্রকৃত ‘চৈতন্যের’ উদয় হয়।

শ্রীরামকৃষ্ণের সেই অমোঘ আশীর্বাদ আজ রাজপথে সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সার্থক হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে যেদিন এই বোধ আসবে যে, ক্ষমতা ভোগের জন্য নয়— সেবার জন্য, সেদিনই হয়তো কল্পতরু উৎসবের প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ হবে।
আশার রূপরেখা: অন্ধকারেই লুকিয়ে থাকে আলো
তবে কি বাঙালির চৈতন্যের সম্পূর্ণ মৃত্যু ঘটেছে? না, তা নয়।সাম্প্রতিককালে বেশকিছু সদর্থক উদাহরণ এক্ষেত্রে তুলে ধরা যেতে পারে-
আর জি কর কাণ্ড হোক বা ভয়াবহ করোনা মহামারি—বিপদে পড়লে বাঙালি আজও যেভাবে দল-মত নির্বিশেষে পথে নামে,তাতে সেই সুপ্ত চেতনারই প্রতিফলন ঘটে।

আমরা দেখেছি,বছর দুই-তিন আগেও কোভিডকালে,একদল তরুণ শহর থেকে গ্রামগঞ্জে অসহায়,অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ‘জীবসেবা’র প্রকৃত আদর্শ মেনে চলছে।আসলে,আমাদের বুঝতে হবে যে চৈতন্য মানে শুধু জপ-তপ নয়,বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও সকল বিভেদ ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরা।এই বোধটুকু বাঙালির মজ্জায় এখনও রয়ে গেছে,যদিও তা এখনও মাঝেমধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

পরমহংসদেব জানতেন চৈতন্য এক দিনে হয় না। এটি একটি নিরন্তর উত্তরণ। কল্পতরু উৎসব কেবল মিষ্টি বিতরণ বা প্রদীপ জ্বালানোর উৎসব নয়, এটি নিজের ভেতরের ‘অহং’কে পুড়িয়ে ‘চৈতন্য’ বা বোধকে জাগিয়ে তোলার অঙ্গীকার।বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব তার মেধায় নয়, তার হৃদয়ে। যেদিন আমরা উৎসবের আড়ম্বর ছেড়ে একে অপরের চোখের জল মোছাকেই শ্রেষ্ঠ ধর্ম মনে করব,সেদিনই হয়তো ঠাকুরের সেই আশীর্বাদ— “তোমাদের চৈতন্য হোক”— সার্থকতা পাবে।আসলে,বাঙালির চৈতন্য পুরোপুরি উদয় হয়নি ঠিকই,কিন্তু সেই সুপ্ত অগ্নিশিখাটি নেভেনি,প্রয়োজন শুধু সেই আগুনের দিকে ফিরে তাকানোর।









