মাঘ শুক্লা চতুর্থী হলো শ্রীগণেশের আবির্ভাব তথা জয়ন্তী এবং তার সাথে গণেশজননী জয়দুর্গার আবির্ভাব ও পূজার তিথি। অবশ্যই গণেশ ও গণেশ কে নিরন্তর স্তন্যপানে নিরতা গণেশজননী রূপে শ্রীদুর্গার আবির্ভাব একই দিনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। এর প্রমাণ তন্ত্র ও পুরাণ দুই স্থলেই মেলে :-
পুরাণে :-
এই মাঘ শুক্লা চতুর্থী মাহাত্ম্য মুদ্গল পুরাণে বর্ণিত আছে ঋষি শৌনক ও রাজা সোমের কথোপকথনে। ঋষি শৌণক কে ভৃগু মুণি এই মহতি তিথি তথা শ্রী গণেশের মাহাত্ম্যের যে বর্ণনা পূর্বে করেছিলেন তাহাই শৌনক ঋষি রাজা সোম কে প্রদান করেন এবং রাজা এই গৌরী গণেশ তিথি পালনের ফলে দুঃখ কষ্ট থেকে চির নিস্তার পান। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এই গণেশজননীর মাহাত্ম বর্ণনা করা হয়েছে। তিনিই যে জয়দুর্গা তার প্রমাণ ব্রহ্মবৈবর্তে খুঁটিয়ে দেখলে পাওয়া যায় কারণ ব্রহ্মবৈবর্তে দুর্গার বিধানে জয়দুর্গার দশাক্ষরী মন্ত্র সর্বত্র এবং জয়দুর্গার দুটি স্তোত্র বর্তমান। যে ভৃগু ঋষি শৌনক ঋষি কে মুদ্গলপুরাণে এই গৌরীগণেশ তিথির মাহাত্ম বলেন তাঁরই প্রদত্ত একটি গণেশজননীর কবচ বেতাল সংহিতায় পাওয়া যায় – যা এই post এর শেষে দেওয়া হয়েছে।
তন্ত্রে :-
শক্তিসঙ্গম তন্ত্রে বর্ণিত আছে যে সূর্য মকর রাশিতে থাকাকালীন চান্দ্রমাঘের চতুর্থী হলো গণপতি রাত্রি। মকর রাশি নিরপেক্ষও মাঘ শুক্ল চতুর্থী ভারতবর্ষে গণপতি জয়ন্তি ও গণপতি রাত্রি হিসেবে পালিত হয়৷ এই তিথি তে গণপতির পাশাপাশি গৌরী-গণেশ বা গণেশজননীর পূজার বিধান ও আগমোক্ত ঘরানায় যথেষ্ট সমাদৃত। ফেৎকারিণী তন্ত্রে স্পষ্ট এই গণেশজননী কে সাক্ষাৎ জয়দুর্গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে৷ ফেৎকারিণী তে এটিই জয়দুর্গার প্রধান রূপ। এই ধ্যান টি post এ দেওয়া হয়েছে। এই তিথি মাঘ গুপ্ত নবরাত্রির অন্তর্গত। এই মাঘ গুপ্ত নবরাত্রি তন্ত্র সম্প্রদায়ে দুর্গাকুলে জয়দুর্গা নবরাত্রি হিসেবে গণ্য। এই নবরাত্রির নবমী তে সিংহবাহিনী চতুর্ভুজা জয়দুর্গার আবির্ভাব।
গণেশ চতুর্থী মহারাষ্ট্রে বিশেষ ভাবে পালিত হলেও, গণেশ জয়ন্তী ( মাঘ শুক্লা চতুর্থী) কেই গণেশ আবির্ভাব হিসেবে পালন করা হয়৷ এই দিন মধ্যাহ্নে শ্রী গণেশের পূজায় বিশেষ ফল শাস্ত্রে বর্ণিত আছে। মুদ্গল পুরাণে সারা দিন উপবাস সহ চতুর্থী ব্রত উজ্জাপন করে রাত্রে কেবল এক কালীন আহার করে পরের দিন পঞ্চমী তে উপবাস ভঙ্গের বিধান দেওয়া আছে। এই দিন গৌরীগণেশের ব্রত কথা শ্রবণ মনন ও পাঠে বিশেষ ফলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
গণেশজননী জয়দুর্গার ধ্যান, প্রণাম, স্তুতি ও কবচ :-
ধ্যান :-
ওঁ ধ্যায়েদ্দুর্গাং জয়াখ্যাং গজমুখজননীং বিশ্বরূপাং ভবানীং।
হেরম্বং পায়য়ন্তীং স্তনমনবরতং রত্নসিংহাসনস্থাম্ ।।
ব্রহ্মাদ্যৈর্দেববৃন্দৈর্যুগকরকলিতাং সেবিতাং সিদ্ধসংঘৈ ।
রত্নালংকারপুরাং পরমশিববধূমভ্রবর্ণাং ত্রিনেত্রাম্ ।।
( অর্থ – এমন “জয়া” নামে খ্যাতা দূর্গার ধ্যান করি যিনি গণেশজননী, বিশ্বরূপা ,ভবানী ! যিনি রত্নসিংহাসনের উপর বিরাজমান হয়ে হেরম্বকে (গণেশকে) স্তণ্যদানে অনবরত নিরতা ! ব্রহ্মাদি দেবতাগান যাকে ঘিরে হাত জোড় করে বন্দনা করছেন এবং সিদ্ধগণ যার সেবা করছেন ! পরমশিবের গৃহিণী , যিনি রত্নালাংকারে ভূষিতা , মেঘ / স্বর্ণ বর্ণা ও ত্রিনেত্রা ! )
প্রণাম :-
“ওঁ সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে ।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণি নমোহস্তুতে”।
( হে দেবী শিবের পত্নী সকল মঙ্গলে তুমি মঙ্গল স্বরূপা,কল্যাণদাত্রী,সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী, আশ্রয়দাত্রী, ত্রিনয়না,গৌরী, নারায়নী, তোমাকে প্রনাম জানাই। )
আরও পড়ুনঃ নীল সরস্বতী কে তিনি? দেবী স্বরসতীর রূপ নাকি দেবী তারার উগ্র রূপ!
স্তোত্র :-
” নারায়ণ উবাচ :-
গণেশমাতাদুর্গা যা শিবরূপা শিবপ্রিয়া ।
নারায়ণী বিষ্ণুমায়া পূর্ণব্রহ্মস্বরূপিণী ।।
ব্রহ্মাদিদেবৈর্মুনিভির্মনুভিঃ পূজিতা সদা ।
সর্বাধিষ্টাত্রীদেবী সা ব্রহ্মরূপা সনাতনী ।।
যশোমঙ্গলধর্মশ্রীসত্যপুণ্য প্রদায়িনী।
মোক্ষহর্ষপ্রদাত্রীয়ং শোকদুঃখার্তিনাশিণী ।।
শরণাগতদীনার্ত পরিত্রাণপরায়ণা ।
তেজঃ স্বরূপা পরমা তদধিষ্ঠাতৃদেবতা ।।
সর্বশক্তিস্বরূপা চ শক্তিশিবস্য সন্ততম্ ।
সিদ্ধেশ্বরী সিদ্ধরূপা সিদ্ধিদা সিদ্ধিদেশ্বরী ।।
বুদ্ধির্নিদ্রা ক্ষুত্পিপাসা ছায়া তন্দ্রা দয়া স্মৃতিঃ।
জাতিঃ ক্ষান্তিশ্চ শান্তিম্চ কান্তিশ্চ চেতনা ।।
তুষ্টিঃপুষ্টিস্তথা লক্ষ্মীর্বৃত্তির্মাতা তথৈবচ।
সর্বশক্তিস্বরূপা সা কৃষ্ণস্যপরমাত্মনঃ।। ”
( ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ – প্রকৃতি খন্ড – প্রথম অধ্যায় )
( অর্থ :- গণেশজননী দুর্গা, যিনি শিবরূপা শিবপ্রিয়া, তিনিই নারায়ণী বিষ্ণুমায়া ও পূর্ণব্রহ্মস্বরূপিণী। এই দেবী ব্রহ্মাদি দেবতাগণ তথা মুনিগণ ও মনুগণ দ্বারা সর্বদা পূজিতা। তিনি সমস্ত কিছুর অধিষ্টাত্রী, সাক্ষাৎ ব্রহ্ম স্বরূপা ও সনাতনী। তিনি যশ, মঙ্গল, ধর্ম, শ্রী, সত্য, তথা পুণ্য, মোক্ষ, পরমানন্দ এই সকল প্রদান করেন এবং তিনিই সকল শোক দুঃখ কষ্ট নাশ কারিনী। যে সকল দীন ও আর্তগণ তার শরণাগত হন তাদের সকলকে তিনি সর্বদা পরিত্রাণে পরায়ণা হন। তিনি তেজ স্বরূপা, পরমা ও সমস্ত কিছুর অধিষ্টাত্রী দেবতা। তিনি সর্বশক্তিস্বরূপা এবং সর্বদা শিবের শক্তি রূপে যুক্তা। তিনি সিদ্ধেশ্বরী, সিদ্ধরূপা, সিদ্ধিদা তথা সিদ্ধিদেশ্বরী । বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা, পিপাসা, ছায়া, তন্দ্রা, দয়া, স্মৃতি, জাতি, ক্ষান্তি, শান্তি, কান্তি, চেতনা, তুষ্টি, পুষ্টি, লক্ষ্মী, র্বৃত্তি এই সকলেই তিনি বিদ্যমানা তথা সকলের মাতা তিনি। তিনিই সর্বশক্তিস্বরূপা এবং শ্রী কৃষ্ণ রূপা পরমাত্মন।)
কবচ :-
ভৃগু উবাচ-
“প্রাচ্যাং রক্ষতু হেরম্বশ্চাগ্নেয়্যামগ্নিরূপিনীম্।
যাম্যাং কাত্যায়ণী রক্ষেনৈরৃত্যাং পার্বতীসুতঃ।।
প্রতীচ্যাং বক্রতুণ্ডস্তু বায়ব্যাং বরদা শিবা ।
উদীচ্যাং গণপঃ পাতু ঈশান্যামীশবন্দিতা।।
ঊর্ধ্বং রক্ষেদ্ধূম্রবর্ণো হ্যধস্তাৎপাপনাশিনী।
এবং দশ দিশো রক্ষেৎসুমুখো বিঘ্নজননীঃ।
গনেশজননীমিদং ত্রিকালং যঃ পঠেন্নরঃ।
জ্বরে চ সঙ্কটে ঘোরে সংগ্রামে মুচ্যতে ভয়াৎ।।”
শ্রী বেতাল সংহিতায়াং নবমধ্যায়েঃ গনেশজননী কবচম্ সম্পুর্ণম্ ।
অর্থাৎ-(পুর্বকথন,মহর্ষি ভৃগু একদা রাজা গণেশ কে বলছেন ।ভৈরব একদা মহেশ্বরের প্রতি জিজ্ঞাসা করিলেন-হে দেবদেব !মহাদেব !সর্বশাস্ত্র বিশারদ!আপনি ফেৎকারিনী তন্ত্রে যে জয়াখ্যা গণেশজননী দুর্গার সংঙ্কেত বলেছিলেন ।কিন্তু কোথাও তাঁর রক্ষাবিধান করেননি, এইক্ষনে হে হর!আপনি আমাকে তাহা কৃপাকরি বলুন।তখন মহেশ্বর যে কবচটি প্রকাশ করেছিলেন বিঘ্ননায়ক! আমি তাহা বলছি শ্রবণ করো।)
ভৃগু বলিলেন-
( সম্মুখে আমাকে হেরেম্ব রক্ষাকরুন,অগ্নিকোনে অগ্নিরূপিনী রক্ষা করুন। যমকোন তথা দক্ষিণে কত্যায়ণী ও নৈঋতকোনে পার্বতীসুত রক্ষা করুন।পশ্চাতে বক্রতুণ্ডয় ও বায়ুকোনে বরদা শিবা রক্ষা করুন। উদীচে গনপ রক্ষা করুন ও ঈশান কোনে মধ্যে ঈশবন্দিতা।ঊর্ধ্বে ধূম্রবর্ণ রক্ষা করুন,অধে পাপনাশিনী। এরূপ দশদিকে সুমুখো গনেশ ও বীঘ্নজননী রক্ষা করুন। এই গনেশজননী কবচ যে ত্রিকাল পাঠ করে, জ্বরাদিরোগে ,বিপদে,ঘোরে, সংগ্রামে তার ভয় মোচন হয়। )
নমঃ জয়দুর্গায়ৈ
গৌরীগণেশায় নমঃ





