জেন জি আন্দোলনের জেরে গত বছরই নেপালে সরকার পতন হয়েছিল, তার পর প্রথমবার নির্বাচনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নেপালে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটে নির্ধারিত হবে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পর দেশের নতুন সরকার কারা গঠন করবে এবং আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক দিশা কোন পথে এগোবে। গত বছরের আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই অস্থিরতার পর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হচ্ছিল।
আরও পড়ুনঃ বন্ধ স্কুল-কলেজ, ‘টু জি’-তে নামল ইন্টারনেট পরিষেবা; তীব্র বিক্ষোভ কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে
এই নির্বাচনকে নেপালের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দেউবা, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের কেপি শর্মা ওলি এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী কেন্দ্র)-এর পুষ্প কমল দাহাল। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এঁরাই দেশের রাজনীতির প্রধান মুখ। তবে এবার তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের দাবিতে সরব তরুণ প্রজন্ম।
প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে উঠে এসেছেন একাধিক তরুণ নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির রবি লামিছানে, যিনি প্রাক্তন সংবাদমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। তিনি নিজেকে সংস্কারপন্থী ও প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ ভোটারদের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ৭৪ বছর বয়সি কেপি শর্মা ওলি পূর্ব নেপালের ঝাপা-৫ আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ৩৫ বছর বয়সি র্যাপার থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বলেন্দ্র শাহ, যিনি কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র। তরুণদের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি।
এছাড়া নেপালি কংগ্রেসের নবনিযুক্ত সভাপতি গগন থাপাও প্রধানমন্ত্রিত্বের অন্যতম দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছেন। ৪৯ বছর বয়সি থাপা দক্ষিণ নেপালের সরলাহী-৪ কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটদানের আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্গম ও তুষারাবৃত অঞ্চলেও ভোটের সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের ১০টি সর্বোচ্চ পর্বতের মধ্যে আটটি নেপালে অবস্থিত, যার মধ্যে সর্বোচ্চ শৃঙ্গও রয়েছে। ফলে ভোট পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের কাছে।
মোট ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদের জন্য ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর মধ্যে ১৬৫ জন সরাসরি নির্বাচিত হবেন এবং বাকি ১১০টি আসন অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বণ্টন করা হবে। ভোটগণনা কয়েক দিন ধরে চলতে পারে। রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল হলে সরকার গঠনে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নেপালের জনগণ ক্ষমতার দায়িত্ব পুনরায় প্রবীণ নেতৃত্বের হাতে তুলে দেন, নাকি নতুন ও তরুণ মুখের উপর আস্থা রাখেন।
আরও পড়ুনঃ ইরানের ওপর হামলায় ভারতের ঘাঁটি ব্যবহার করছে আমেরিকা! মুখ খুলল ভারত
নেপালের মানুষ আজ, ৫ মার্চ, নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য ভোট দিচ্ছেন। আজকের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তিন লক্ষেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। দেশের কার্যনির্বাহী নির্বাচন কমিশনার রাম প্রসাদ ভাণ্ডারি বুধবার সন্ধ্যায় জানান, ভোটের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সকাল সাতটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গণনা শুরু করা হবে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে যুবসমাজের হিংসাত্মক আন্দোলনের জেরে কেপি শর্মা অলির সরকার পতনের পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার দেশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লক্ষ ভোটার নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদের মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এই ১৬৫ জনকে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি নির্বাচিত করবেন। বাকি ১১০টি আসন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী পাবে।
গত কয়েক বছর ধরে নেপালে মূলত তিন প্রধান দলের প্রভাবশালী জোট সরকার গড়ে উঠেছে ও ভেঙেছে। কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (একীভূত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী কেন্দ্র) এবং নেপালি কংগ্রেস এই তিন দলের আধিপত্যই দেশের রাজনীতিতে প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে বলেন্দ্র শাহ বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসায় রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।









