মনে পড়ে সেই অভিশপ্ত ২০১২ সালের ৮ আগস্টের কালো দিনটির কথা?
ঝাড়গ্রাম বেলপাহাড়ির ধুলোবালি মাখা তৃণমূলের জনসভায় দাঁড়িয়ে এক নিরীহ, প্রান্তিক কৃষক শিলাদিত্য চৌধুরী বুকভরা আশা নিয়ে সদ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিজের দিদি’কে একটি প্রশ্ন করেছিলেন। অতি সাধারণ এক চাষির সরল, করুণ প্রশ্ন ছিল—সারের আকাশছোঁয়া দাম আর ধানের সহায়তাকারী মূল্য এতো কম কেন দিদি?
আর তার বদলে সেই পাষাণ, অহংকারী শাসক তাকে কী উপহার দিল? ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে, বিনা দোষে একটা জলজ্যান্ত, তরতাজা মানুষকে মাওবাদী আখ্যা দিয়ে খাঁচায় বন্দি করা হলো! দিনের পর দিন জেলের অন্ধকূপে পচিয়ে মারা হলো।
আরও পড়ুনঃ শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশন পড়ালেই কড়া নজরে, নির্দেশ দিল শিক্ষা দফতর
সেদিন তৃণমূলের জনসভা শেষ হতে না হতেই ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শিলাদিত্যের ওপর। ক্ষমতার অহংকারে মত্ত শাসকের ইশারায় একটা নিরীহ কৃষকের গায়ে লেপে দেওয়া হলো দেশদ্রোহীর তকমা।একটা মানুষের জীবন থেকে একটা-দুটো দিন নয়, আদালতের দুয়ারে ঘুরতে ঘুরতে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ১২টি বসন্ত চিরতরে কেড়ে নেওয়া হলো।
অথচ কী চরম পরিহাস! বছরের পর বছর তদন্ত করেও পুলিশ তার সাথে মাওবাদীদের দূর-দূরান্তের কোনো সম্পর্কই খুঁজে পেল না। তাহলে কার ইগো, হিংস্র লালসা আর পৈশাচিক অহঙ্কার মেটাতে একটা নিরপরাধ মানুষের সোনালী তরতাজা যৌবনকে জেলের দেওয়ালে পিষে মারা হলো? এর জবাব কে দেবে? তৃণমমূলের কাছে কি এর কোনো জবাব আছে ?
শিলাদিত্য কোনো দাগী অপরাধী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই বাংলার মাটির সন্তান, একজন কপালপোড়া প্রান্তিক চাষি। প্রতিদিন সারের চড়া দাম আর ধানের জলের দরের চিন্তা যার বুকটা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, যিনি নিজের সন্তানের মুখে দুটো অন্ন তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। একজন সর্বহারা চাষি হয়ে নিজের ঘামঝরা ফসলের ন্যায্য মূল্য চাওয়া কি এতটাই বড় পাপ ছিল, যার শাস্তি ১২ বছরের নরকযন্ত্রণা?
সেদিন বিনপুরের ওই তৃণমূলের মিটিংয়ে যখন শিলাদিত্য গিয়েছিলেন, তখন তাঁর মনে বিন্দুমাত্র কোনো চক্রান্ত ছিল না। তিনি তো অন্য কেউ নন—তিনিও ছিলেন পরিবর্তনের একনিষ্ঠ সমর্থক। সিপিআইএম-এর রক্তচক্ষু আর অত্যাচার উপেক্ষা করে, এই দিদিকে ক্ষমতায় আনতে নিজের জান লড়িয়ে লড়াই করেছিলেন এই মানুষটাই।
সেদিন যখন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মঞ্চ থেকে দম্ভভরে চিৎকার করে বললেন, কারও কোনো প্রশ্ন আছে? —তখন শিলাদিত্য দিদির ওপর অগাধ বিশ্বাস আর সরল মন নিয়ে প্রশ্নটা করে বসেছিলেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবতেও পারেননি, যাকে ভালোবেসে, বিশ্বাস করে নিজের মাথার ওপর বসিয়েছেন, তিনিই আসলে এক ছদ্মবেশী রাক্ষসী রূপ ধারণ করবেন।
আহা! হতভাগ্য শিলাদিত্য যদি আগে থেকে জানতেন যে এই শাসকের মুখের মেকি ভাষা আর ভেতরের কুৎসিত, হিংস্র রূপটা এক নয়—তাহলে হয়তো তিনি সেদিন মুখ বুজেই থাকতেন। বিশ্বাসের এমন নির্মম, পৈশাচিক বলিদান পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও দেখেছে কেউ?
আজ দীর্ঘ বছর পর, সেই বুক চিতিয়ে কথা বলা মানুষটার দিকে তাকালে চোখের জল ধরে রাখা যায় না, বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যায় এটা দেখলে যে, সেই অন্নদাতা আজ আর চাষ করেন না। যে হাত একসময় বাংলার মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য মাটি খুঁড়তো, যে হাত লাঙল ধরতো—পেটের তাগিদে, বেঁচে থাকার তাগিদে আজ সেই হাত বাসের কন্ডাক্টরি করে সামান্য কটা টাকার জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে।
আজ বিনপুর থেকে মেদিনীপুর রুটের বাসে উঠলে, টিকিট কাটার জন্য হাত বাড়ানো সেই করুণ, সব হারানো মানুষটার মুখ দেখতে পাবেন। যে মুখে একসময় প্রতিবাদের তেজ ছিল, আজ সেখানে শুধুই এক বুক শূন্যতা আর বিষাদ।
কিন্তু কেন জানেন? কেন একজন কৃষক তাঁর সাধের চাষবাস ছেড়ে বাসের কন্ডাক্টর হলেন?
জেল থেকে যখন একটা জ্যান্ত লাশ হয়ে শিলাদিত্য বেরিয়ে এলেন, তখন তাঁর বুকটা অভিমানে, অপমানে আর তীব্র ঘৃণায় ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। যে চাষিদের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে এই নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন শাসক তাঁর জীবনটা ছারখার করে একজন দেশদ্রোহী বানিয়ে দিল, শিলাদিত্য সিদ্ধান্ত নিলেন—সেই মাটির সাথে তিনি আর কোনো সম্পর্ক রাখবেন না।
বুকভরা কান্না আর চরম অপমানে নিজের বাপ-ঠাকুরদার পবিত্র পেশাটাই চিরতরে বিসর্জন দিলেন তিনি। মাটির ওপর তাঁর এতটাই অভিমান হলো যে, তিনি আর কোনোদিন মাটিতে হাত দিলেন না। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, এর চেয়ে বড় দীর্ঘশ্বাস আর কী হতে পারে? একটা জলজ্যান্ত মানুষের আত্মাকে এভাবে খুন করা হলো।
ওই নির্মম তৃনমূল সরকার গত ১৫ বছরে কত মায়ের কোল খালি করেছে, কত শিলাদিত্যের মতো সোনার টুকরো মানুষের জীবনটাকে তছনছ করে শ্মশান বানিয়ে দিয়েছে, তার কি কোনো হিসাব আছে?
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সেই দুঃসময়ে শিলাদিত্যর পাশে কেউ ছিল না। নিঃসঙ্গ সেই দিনগুলোতে শুধু বিজেপি নেতারাই গোপনে জেলে গিয়ে হাত ধরে বলতেন—ভয় পেয়ো না, আমরা আছি তো তোমার সাথে।
তাই আজ যখন ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই ভাইপোকে একটি ডিম ছোড়ার জন্য কেউ কেউ মায়াকান্না কাঁদে, তখন বাংলার সাধারণ মানুষের বুক থেকে সহানুভূতির একটা ফোঁটাও বের হয় না—বরং ছিটকে বের হয় শুধুই তীব্র ঘৃণা, থুতু আর অভিশাপ। বাংলার মানুষ আজ আর তৃণমূলের ওই চোখের জল আর অভিনয়ের ভন্ডামিতে ভোলে না, মানুষ এদের অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঘৃণা করে।
এটাই চরম সত্য, আর এটাই প্রকৃতির অমোঘ বাস্তব—পাপ কখনো বাপকেও ছাড়ে না। নিরীহ মানুষের চোখের জল কোনোদিন বৃথা যায় না। শিলাদিত্য আর তাঁর পরিবারের প্রতি ফোঁটা চোখের জলের হিসাব প্রকৃতি আজ কড়ায়-গন্ডায় উসুল করে নিচ্ছে এবং আগামী দিনেও টেনে টেনে নেবে। তাইতো এই দলটা আজ ভেঙ্গে ছাড়কার হয়ে যাচ্ছে এদের ধ্বংস অনিবার্য?



