সাধারণ মানুষের কাছে জমি বা সম্পত্তি দখলের খবর পরিচিত হলেও, খোদ কলকাতা শহরের বুকে একটি আস্ত টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলের অফিস দখলের ঘটনা যে ঘটতে পারে, তা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু তৎকালীন পার্ক স্ট্রিটের হোয়াইট হাউস বিল্ডিংয়ে অবস্থিত ‘কলকাতা টিভি’র অতীতের ঘটনাক্রমকে কেন্দ্র করে এমনই এক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এনেছেন চ্যানেলের প্রাক্তন সব কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় মদতে একটি সচল টেলিভিশন চ্যানেলকে পরিকল্পিতভাবে দখল করে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ আজ রাজ্যের লোক ভবনে ৩৫ মন্ত্রীর শপথ
দখলের প্রেক্ষাপট: শেয়ারের লড়াই ও চরম অনিশ্চয়তা
প্রাক্তন কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় টিভি নাইন গোষ্ঠী ওই চ্যানেলের ৮৬ শতাংশ শেয়ার কিনেছিল। বাকি ১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল তথাগত দত্তের দখলে। টিভি নাইন গোষ্ঠী চ্যানেলটি পরিচালনার উদ্দেশ্যে ওই ১৪ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের দাবি জানালেও তথাগত দত্ত তা দিতে রাজি হননি। সেই সময় চ্যানেলটি তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিল। দীর্ঘ দিন বেতন না পাওয়ায় কর্মীদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। চ্যানেলটি ঠিকমতো না চলায় রিপিট টেলিকাস্টের ওপরই ভরসা করতে হয়েছিল। টিভি নাইন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন দাবি ছিল, শেয়ার হস্তান্তর না করলে তারা চ্যানেলটির দায়িত্ব নেবে না। এই জটিল পরিস্থিতিতেই শুরু হয় রাজনীতির নোংরা খেলা।
বন্দুকের নলের মুখে দখলদারির অভিযোগ
প্রাক্তন কর্মীদের অভিযোগ, সেই সময় কিছু কর্মী তথাগত দত্তের পক্ষ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হন। এরপরই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। অভিযোগ, তৎকালীন তৃণমূল নেতা ও কাউন্সিলর রাজীব দেব, সুলতান আহমেদ, ইকবাল আহমেদ এবং শোভন চট্টোপাধ্যায় সহ বহু তৃণমূল নেতার নেতৃত্বে এক বিশাল মাস্তান বাহিনী একদিন বিকেলে পার্ক স্ট্রিটে অবস্থিত কলকাতা টিভির অফিসে চড়াও হয়।
কর্মীদের দাবি, তৃণমূলের ওই বাহিনী অফিসে ঢুকে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় এবং বন্দুকের মুখে তাঁদের অফিস থেকে বের করে দেয়। অথচ, মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া সত্ত্বেও কর্মীরা আশা নিয়ে অফিসে যেতেন, যদি কোনোভাবে টিভি নাইন ফিরে আসে এবং চ্যানেলটি পুনরায় চালু হয়। কিন্তু এই দখলের পর সেই সামান্য আশাটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা কৌস্তভ রায় নামে এক ব্যক্তির হাতে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই চ্যানেলটিকে দখল করে তুলে দেয়!
আইনি লড়াই ও দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস
এই ঘটনার পর প্রাক্তন কর্মীরা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় (CMO) এবং তৎকালীন পুলিশ কমিশনার গৌতম মোহন চক্রবর্তীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তবে অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসন থেকে কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট হায়দারাবাদ থেকে এসে পরিস্থিতি দেখে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। প্রাক্তন কর্মীদের দাবি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি কর্মীদেরও সেই মামলায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। তবুও দীর্ঘ বহু বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কর্মীরা আজও তাঁদের বকেয়া বেতন এবং ৫ বছরের পিএফ (PF)-এর টাকা পাননি।
আরও পড়ুনঃ আজ থেকে সরকারি বাসে ফ্রি যাতায়াত মহিলাদের
নতুন অভিযোগ ও তদন্তের দাবি
বর্তমানে কলকাতা টিভির অন্দরে কর্মরত কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, বর্ধমান দক্ষিণের প্রাক্তন বিধায়ক খোকন দাসের তোলাবাজির টাকাও নাকি এই চ্যানেলে বিনিয়োগ করা হয়েছে ।
চ্যানেল দখলের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাক্তন কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের পারদ তুঙ্গে। সেইসময় বহুকর্মী কাজ হারায়। একজন আত্মহত্যা করেছিল! দাবি উঠেছে শুধু দখলদারি নয়, বরং এই চ্যানেলের আর্থিক উৎস ও বিনিয়োগ নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
কলকাতা টিভির উত্থানের সময় চ্যানেলটি সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ছিল। সেই চ্যানেলকেই পরবর্তীকালে দখল করে কৌস্তভ রায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় তৃণমূলের নেতৃত্বে । টাটাদের সিঙ্গুর থেকে হটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসেন ঠিকই তবে তার আগে দখল করিয়ে দিয়েছেন এই নিউজ চ্যানেলের অফিস! তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতির কিরকম তা বাংলার মানুষের সামনে তুলে ধরলাম। পুরোনো কর্মীদের মধ্যে বেশিরভাগ চাইছেন এতবড় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক এবং বঞ্চিত কর্মীরা যেন তাঁদের প্রাপ্য পাওনা বুঝে পান।



