সিংহের প্রার্থী ২৩। রাজ্যে সদস্য মেরেকেটে হাজার পাঁচেক। কোদাল বেলচার ১৫ হাজার সদস্য নিয়ে লড়াই ১৯ আসনে। আর কাস্তে-ধানের শীষের ১৭ জনের নেপথ্য শক্তি কমবেশি ২৫ হাজার সদস্য। ফলে বামফ্রন্টের প্রধান তিন শরিকের এবারের নির্বাচনে ভোট পাওয়ার চেয়েও পরবর্তী সময়ে সংগঠনের অস্তিত্ব ধরে রাখার লড়াই। অথচ, এই শরিদলগুলির বামফ্রন্টের ক্ষমতায় থাকার সময় সে কী দাপট!
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বহু দলীয় কার্যালয় বন্ধ অথবা বেদখল। দেওয়াল লেখার লোক নেই। পতাকা-ফেস্টুন কেনার ফান্ডের আকাল। প্রার্থীর ছাড়া প্রচারের সঙ্গী গাড়ির সেই বহর খুঁজে পাওয়া দায়। বড় র্যালি করার কথা কল্পনাতেও আনতে পারছে না কেউ। কিন্তু সুন্দরবন, মুর্শিদাবাদ, চা বলয় এবং মেদিনীপুরের বরু এলাকায় চুটিয়ে রাজ করেছে এই শরিকদলগুলি একাধিক দপ্তরের মন্ত্রিত্ব নিয়ে। ফরওয়ার্ড ব্লক চোখ বন্ধ করে কলকাতা শহর লাগোয়া বারাসত, দেগঙ্গা জিতত। সীমান্তের বাগদা আসন পেত। গোঘাট, খানাকুলও তাদের ছিল। এবারও ২৩টি আসনে লড়াইয়ে নেমেছে ফরওয়ার্ড ব্লক। মধ্যমগ্রামে লড়ছেন জেলা নেতা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। তিনিও বলেছেন, “লড়াই কঠিন। লোকবল, অর্থ দুই কম। তবু লড়ছি।” তাঁর আসনে আবার জোটসঙ্গী আইএসএফ প্রার্থী দিয়েছে। দলের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায়ও স্বীকার করেন, “সদস্য সংখ্যা তো কমেছেই। সদস্য আছেন হাজার পাঁচেক। সহযোগী হাজার দশেক। অনেকে সদস্যপদ রিনিউ করাননি।”
আরও পড়ুনঃ বাংলায় বিজেপি কার হাত ধরে ঢুকেছিল? মমতা না অটল-মমতা জোট! সিপিএম তাই বলে; কিন্তু আসলে কি তাই?
সিপিআইয়ের ১৭ আসনে লড়াই। একটিতে সমঝোতা হয়নি। তাদের সদস্য মেরেকেটে ২৮ হাজার, যা কিনা ক্ষমতায় থাকার শেষের দিকেও ছিল পৌনে একলাখের উপর। সবচেয়ে বেশি সদস্য এখনও সেই পূর্ব মেদিনীপুরে। অবিভক্ত মেদিনীপুরে বহু বিধানসভা আসন এবং লোকসভাও হইহই করে জিতত কাস্তের উপর ধানের শীষ। এবার লড়াইয়ের দেওয়াল লিখন পড়তে পারছেন তাঁরা। পার্টি ফান্ড তেমন নেই। প্রচারে গিয়েই আর্থিক সাহায্য চাইতে হচ্ছে। নন্দীগ্রামের প্রার্থী শান্তি গিরি যেমন একেবারে আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিউআর কোড দিয়ে সাহায্যের আবেদন করছেন। তবে এবারের ভোটের পর কতজন তাঁদের সদস্যপদ রিনিউ করাবেন তা নিয়ে প্রশ্ন দলেই। কারণ, ক্ষমতায় থাকা এবং না থাকার মধ্যে ফারাকটা কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে তা ফি বছর টের পাচ্ছেন সিপিআই নেতারা। দলের রাজ্য সম্পাদক স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের ফান্ড নেই বলেই এভাবে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিতে হচ্ছে। আর ক্ষমতার বৃত্ত থেকে সরে যাওয়ায় দলীয় সদস্য যে কমেছে, তা তো অস্বীকার করার কিছু নেই।”
আরএসপির রাজ্য সম্পাদক তপন হোড়ের হিসাবে হাজার ১৫ সদস্য আছেন তাঁদের। একসময় সুন্দরবনের গোসাবা, বাসন্তী, উত্তরের আলিপুরদুয়ার, দক্ষিণ দিনাজপুর তাঁদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। বালুরঘাট থেকে টানা জিততেন বিশ্বনাথ চৌধুরী। পুরসভা ছিল দখলে। সেখানে প্রচারের ফাঁকে তপনবাবু জানান, “সদস্য কমাটা তো স্বাভাবিক। ফলে শক্তি ক্ষয়ের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তার মধ্যেই লড়াই জারি আছে।” বাসন্তী থেকে রাজ্যে পালাবদলের বছর, ২০১১ সালেও জিতেছেন আরএসপির সুভাষ নস্কর। তিনি তার আগে মন্ত্রীও ছিলেন। সুভাষবাবুর হিসাবে, বাসন্তীতে সাড়ে তিনশো, গোসাবায় চারশো মতো সদস্য রয়েছেন। আমাদের ঝড়খালি, ক্যানিংয়ের আঠারোবাঁকি পঞ্চায়েতেও কোথাও সেভাবে আমরা নেই। ভোটে লড়ার টাকা পেতে মানুষই ভরসা। এখনও তো সেভাবে দেওয়াল লিখনই শুরু করা গেল না। আগে ব্লক স্তরে বা কেন্দ্রীয়ভাবে পোস্টার আসত প্রচারের। টাকার অভাবে পোস্টারের সংখ্যাও কমবে।”
আরও পড়ুনঃ ‘ভবানীপুরে এবার পাঁঠাবলি হবে’! হাঁড়িকাঠে কার মুখ?
বর্ষীয়ান নেতা সুভাষবাবুও স্বীকার করেছেন, আমরা তো বটেই শরিকদলগুলি খুব একটা স্বস্তিতে নেই ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরে এবং শাসকদলের সন্ত্রাসের কারণে। বাসন্তী, খানাকুল-সহ আরএসপির তিনটি আসনে গোঁজ। সমঝোতা হয়নি আইএসএফের সঙ্গে। শরিকি সমঝোতা না হয় পরের কথা, কিন্তু তলানিতে যাওয়া সদস্যসংখ্যা, যাঁদের মধ্যে আবার অনেকেই সেভাবে সক্রিয় নন, এই অবস্থায় সংসদীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা শরিকদলের আগামীই যে গভীর সঙ্কটে। রাজ্য রাজনীতির বড় জোটের সঙ্গীদের ছবিটাই মুছে যেতে বসেছে, যা এখনই নিভু নিভু।



