মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের খরা মেটানোর স্বপ্নে যখন ৪৪ হাজার কোটি টাকার ‘কেন-বেতওয়া লিঙ্ক প্রজেক্ট’ (Ken-Betwa Link Project) ডানা মেলছে, ঠিক তখনই ছতরপুর ও পান্না জেলার ঘন অরণ্য আর পাথুরে জমিতে এক চরম হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে।
যেখানে ৪৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে সরকার দুই নদীর জল মিশিয়ে সমৃদ্ধি আনার কথা বলছে, সেখানে কয়েক হাজার আদিবাসী মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন। তাঁদের এই লড়াই সাধারণ কোনো প্রতিবাদ নয়, একে বলা হচ্ছে ‘চিতা আন্দোলন’। ছতরপুর জেলার আদিবাসী নারী ও কৃষকরা নিজেদের জন্য চিতা সাজিয়ে সেখানে শুয়ে পড়ে প্রশাসনকে জানিয়ে দিচ্ছেন—ভিটেমাটি ছাড়া করার চেয়ে তাঁদের পুড়িয়ে মারাই শ্রেয়।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো কেন (Ken) নদীর উদ্বৃত্ত জল বেতওয়া (Betwa) নদীতে প্রবাহিত করা, যাতে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে সেচ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু এই মহৎ উদ্দেশ্যের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের কান্না।
সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী, এই প্রকল্পের ফলে প্রায় ২৪টি গ্রাম সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে ৮টি গ্রাম পুরোপুরি জলের তলায় তলিয়ে যাবে এবং বাকি ১৬টি গ্রামকে পান্না টাইগার রিজার্ভের (Panna Tiger Reserve) বাফার জোনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অর্থাৎ, কয়েক শতাব্দী ধরে যে অরণ্য ও জমি ছিল এই আদিবাসীদের প্রাণভোমরা, আইনি মারপ্যাঁচে তা আজ তাঁদের কাছেই নিষিদ্ধ হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুনঃ ১৮০ জন নাবালিকাকে যৌন লালসার শিকার! কাঠগড়ায় মহারাষ্ট্রের এপস্টেইন মহম্মদ আয়াজ!
কেন এই চরম পথ বেছে নিলেন আদিবাসীরা?
চিতা আন্দোলনের অন্যতম কারণ হলো পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের চরম বৈষম্য। প্রশাসন বর্তমানে উচ্ছেদ হওয়া পরিবার পিছু ১২.৫ লক্ষ টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই সামান্য অর্থ দিয়ে বর্তমানে কোথাও চাষযোগ্য জমি কেনা সম্ভব নয়। আদিবাসীদের মূল দাবি হলো ‘জমির বদলে জমি’।
তাঁরা চান সরকার তাঁদের নতুন জায়গায় চাষযোগ্য জমি দিক এবং পুরো গ্রামটিকে একটি একক হিসেবে পুনর্বাসিত করুক, যাতে তাঁদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন অটুট থাকে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর কোনো সদুত্তর মিলছে না। বরং অভিযোগ উঠেছে যে, ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গ্রামসভাগুলির থেকে স্বচ্ছ অনুমতি নেওয়া হয়নি। জাল সই বা অস্পষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে সম্মতি দেখানো হয়েছে বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন।
আন্দোলনের দৃশ্যগুলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। পান্না টাইগার রিজার্ভের কোর এরিয়ায় গত ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে শত শত আদিবাসী পরিবার অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে বাস করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের খাবার এবং জলের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তবুও তাঁরা নড়তে নারাজ। তাঁরা গায়ে মাটি মেখে ‘মাটি সত্যাগ্রহ’ করছেন, কেউ নদীর জলে দাঁড়িয়ে অনশন করছেন। বিশেষ করে মহিলারা এই আন্দোলনে নেতৃত্বের সারিতে রয়েছেন।
পুলিশ যখনই আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে আসে, এই মহিলারা চিতার ওপর শুয়ে পড়ে চরম প্রতিরোধের বার্তা দেন। সম্প্রতি ৯-ই এপ্রিল পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের যে সংঘর্ষ হয়েছে, তাতে উত্তেজনার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে।
পরিবেশগত দিক থেকে বিচার করলে কেন-বেতওয়া প্রকল্প একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। এই প্রকল্পের জন্য পান্না টাইগার রিজার্ভের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হবে। কয়েক লক্ষ (প্রায় ২০ লক্ষের বেশি) গাছ কাটার পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি কেবল বাঘের বাসস্থানই নষ্ট করবে না, বরং মধ্য ভারতের বাস্তুতন্ত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। তদন্তমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র (Environmental Clearance) নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রকল্প খরা মেটানোর চেয়ে বড় কর্পোরেট ঠিকাদারদের মুনাফা জোগানোর বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নের এই বৃহৎ কাঠামোয় প্রান্তিক আদিবাসীদের কণ্ঠস্বর চিরকালই ক্ষীণ, কিন্তু এবার বুন্দেলখণ্ডের চিতা আন্দোলনের আগুন সেই নীরবতাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
আদিবাসী নেতা অমিত ভটনাগর এবং স্থানীয় কৃষকদের মতে, এই লড়াই কেবল ক্ষতিপূরণের নয়, এটি সম্মানের লড়াই। সরকার যখন দেশজুড়ে আধুনিক পরিকাঠামো তৈরির কথা বলে, তখন সেই পরিকাঠামোর নিচে পিষ্ট হওয়া মানুষের গল্পগুলো গণমাধ্যমে খুব কমই জায়গা পায়।
পান্না টাইগার রিজার্ভের ভেতরে অবস্থান ধর্মঘট করার অপরাধে প্রশাসন এখন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ‘ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা করার হুমকি দিচ্ছে। এটি এক অদ্ভুত পরিহাস—যে আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে অরণ্য রক্ষা করে এসেছে, আজ তাঁদেরই অরণ্য থেকে তাড়ানোর জন্য বন্যপ্রাণী আইনের প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বর্তমানের এই সংকটের সাথে ইতিহাসের এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে। যেমনটি আমরা জানি, ঔপনিবেশিক আমলে বা ১৯৪০-এর দশকের কলকাতায় যেভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে ভেঙে শিল্পায়ন বা সামরিক প্রয়োজনে জমি দখল করা হতো, আজও সেই একই মানসিকতা সক্রিয়। পার্থক্য শুধু এই যে, তখন শাসক ছিল বিদেশী, আজ শাসক নিজের দেশেরই প্রতিনিধি।
আরও পড়ুনঃ ‘বদলে দিলে পালটে যাবে!’ মিনাক্ষীর ‘মাস্টারপ্ল্যান’
আদিবাসীদের এই ‘চিতা আন্দোলন’ আসলে আধুনিক ভারতের উন্নয়নের এক কালো দর্পণ। যেখানে সুউচ্চ বাঁধ আর দীর্ঘ খালের নেপথ্যে থাকে ধূলিসাৎ হওয়া কিছু কুঁড়েঘর আর হারিয়ে যাওয়া কিছু গ্রাম্য শ্মশান।
সবশেষে, কেন-বেতওয়া প্রকল্পের এই লড়াই কেবল বুন্দেলখণ্ডের নয়, এটি সারা ভারতের জল-জঙ্গল-জমিনের অধিকারের প্রতীক। প্রশাসন যদি অবিলম্বে এই মানুষের সাথে আলোচনায় না বসে এবং তাঁদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে, তবে এই চিতা আন্দোলনের আগুন ভবিষ্যতে আরও বড় গণবিক্ষোভের রূপ নিতে পারে। সাংবাদিক বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আমাদের দায়িত্ব এই অবহেলিত মানুষের স্বরকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়া। কারণ, জলের অভাব দূর করার নামে চোখের জল ঝরানো কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
উন্নয়নের এই যাত্রায় আমরা কি সত্যিই কাউকে পিছনে ফেলে আসছি না তো? ছতরপুরের আদিবাসী মায়েদের সাজানো সেই প্রতীকি চিতা আজ সেই প্রশ্নই ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে।



