Saturday, 18 April, 2026
18 April
HomeকলকাতাSwami Vivekananda: ষড়যন্ত্রের শিকার বিবেকানন্দ! বিদ্যাসাগর কেন কেড়ে নিয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথের মুখের গ্রাস?

Swami Vivekananda: ষড়যন্ত্রের শিকার বিবেকানন্দ! বিদ্যাসাগর কেন কেড়ে নিয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথের মুখের গ্রাস?

বাঙালি হিসেবে আমাদের ইতিহাসের এই অজানা সত্যিগুলো সবার জানা উচিত।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

চন্দন দাসঃ

ইতিহাসে দুই মহামানবের সাক্ষাৎ। একজন বাংলার নবজাগরণের কান্ডারি— ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। অন্যজন ভবিষ্যতের বিশ্বগুরু— স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই বিদ্যাসাগর মশাইয়ের একটি ভুলেই একদিন চরম অপমানের শিকার হয়ে চাকরি হারাতে হয়েছিল স্বয়ং বিবেকানন্দকে? নেপথ্যে ছিল এক জঘন্য, নীরব ষড়যন্ত্র!

কী ঘটেছিল সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোতে? আসুন, ইতিহাসের পাতা থেকে সেই চাপা পড়া সত্যিটা আজ ডিকোড করা যাক।

আরও পড়ুনঃ আবার বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই! এবার ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামের

পটভূমি: এক রাজপুত্রের ভিখারি দশা (১৮৮৪ সাল)

সালটা ১৮৮৪। ২৫শে ফেব্রুয়ারি। হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন নরেন্দ্রনাথের বাবা, বিখ্যাত অ্যাটর্নি বিশ্বনাথ দত্ত। কলকাতার অভিজাত দত্ত পরিবারে যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। যে ছেলেটি কাল পর্যন্ত রাজপুত্রের মতো থেকেছে, যার বাড়িতে রোজ উৎসব লেগেই থাকত, সে আজ রাতারাতি ভিখারি। আত্মীয়রা সম্পত্তি দখল করার জন্য মামলা ঠুকে দিল। বাড়িতে মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনদের মুখে একবেলা অন্ন তুলে দেওয়ার সামর্থ্য নেই যুবক নরেনের।

চাকরির আশায় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরছেন তিনি। জুতো ছিঁড়ে গেছে, পরনের জামা মলিন। দিনের পর দিন নিজে না খেয়ে মাকে গিয়ে হাসিমুখে বলতেন, “মা, আজ আমার এক বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে, তোমরা খেয়ে নাও।” এই নিদারুণ মিথ্যেটা তিনি বলতেন যাতে পরিবারের মানুষগুলোর পাতে অন্তত খাবারটা কম না পড়ে।

আশার আলো: মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন

অন্ধকার মেঘের ফাঁকে এক চিলতে রোদ হয়ে এল একটি চাকরির প্রস্তাব। নরেন্দ্রনাথের মেধা, ইংরেজি জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্যের খবর পৌঁছাল স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কানে। বিদ্যাসাগর মহাশয় তখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন’-এর (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ সংলগ্ন স্কুল) বউবাজার ব্রাঞ্চে শিক্ষকতার দায়িত্ব দিলেন যুবক নরেন্দ্রনাথকে (আনুমানিক ১৮৮৬ সাল)। মাস গেলে জুটবে ৫০-৬০ টাকা। নরেনের কাছে তখন এটাই বাঁচার একমাত্র সম্বল।

ষড়যন্ত্রের শুরু: ভিলেনের প্রবেশ

কিন্তু নরেন তো আর পাঁচজন সাধারণ মাস্টারের মতো ছিলেন না। তিনি ক্লাসে গিয়ে কেবল গৎবাঁধা বই রিডিং পড়াতেন না। তিনি ছাত্রদের বন্ধু হয়ে উঠলেন। গান গেয়ে, গল্প বলে, পৃথিবীর ইতিহাস আর বিজ্ঞানের নানা অজানা তথ্য দিয়ে তিনি ছাত্রদের মন জয় করে নিলেন। ক্লাসে পিন পড়লে শব্দ শোনা যায়, ছাত্ররা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত তাঁর কথা। গোটা স্কুলে নরেন হয়ে উঠলেন ছাত্রদের চোখের মণি।

আর এই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তাই তাঁর কাল হলো। থ্রিলার সিনেমার মতো দৃশ্যপটে এলেন এক ভিলেন— সূর্যকুমার অধিকারী।

কে এই সূর্যকুমার? তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিজের জামাই এবং ওই স্কুলের সর্বেসর্বা সেক্রেটারি। সূর্যকুমার ছিলেন অত্যন্ত কড়া, অহংকারী এবং ক্ষমতালোভী প্রশাসক। একজন ২৫-২৬ বছরের তরুণ মাস্টারের এত দাপট, এত জনপ্রিয়তা তাঁর ইগোতে মারাত্মক আঘাত করল। সূর্যকুমার মেনে নিতে পারলেন না যে স্কুলের ছাত্ররা সেক্রেটারির চেয়ে একজন সাধারণ শিক্ষককে বেশি সম্মান করছে। শুরু হলো এক জঘন্য, নীরব ষড়যন্ত্র।

আরও পড়ুনঃ ‘আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি’ বিস্ফোরক বায়রন

ক্লাইম্যাক্স: মিথ্যে অভিযোগ এবং সেই চূড়ান্ত নির্দেশ

সূর্যকুমার তক্কে তক্কে ছিলেন। তিনি গোপনে নরেনের বিরুদ্ধে মিথ্যে রিপোর্ট তৈরি করতে লাগলেন। নরেন যেহেতু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যেতেন, তাই মাঝে মাঝেই তিনি ছুটিতে থাকতেন। এই সুযোগটাই নিলেন সূর্যকুমার। “নরেন স্কুলে ঠিকমতো আসে না, ক্লাসে পড়াশোনা না করিয়ে আড্ডা মারে, হিন্দুধর্মের আজেবাজে কথা বলে ছাত্রদের উশৃঙ্খল করছে”— এমন ডজন খানেক মিথ্যে অভিযোগ নিয়ে তিনি হাজির হলেন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে।

বিদ্যাসাগর তখন বার্ধক্যে উপনীত, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ, মনও তিক্ত। তিনি আগের মতো স্কুলে গিয়ে নিজের চোখে সব তদারকি করতে পারতেন না। জামাই এবং সেক্রেটারি সূর্যকুমারের দেওয়া অফিশিয়াল রিপোর্টের ওপর তাঁর অন্ধ বিশ্বাস ছিল।

যে বিদ্যাসাগর যুক্তিবাদী ছিলেন, যিনি প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করতেন না, সেদিন তিনিও এক চরম ভুল করে বসলেন। সূর্যকুমারের আনা মিথ্যে রিপোর্টের সত্যতা তিনি একবারও যাচাই করলেন না। নরেন্দ্রনাথকে ডেকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, “নরেন, এসব কী শুনছি?”

কোনো শোকজ নোটিশ নয়, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ নয়— সোজা বরখাস্ত! অসুস্থ বিদ্যাসাগর চরম বিরক্তি নিয়ে নির্দেশ দিলেন: “নরেনকে বলে দিও, কাল থেকে যেন আর স্কুলে না আসে!”

পরিণতি: ধ্বংস না সৃষ্টি?

চরম অপমান! ঘাড় ধাক্কা খাওয়ার চেয়েও বড় অপমান। যে ছেলেটা পরিবারের মুখে এক মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ লড়ছিল, তার মুখের গ্রাসটুকু কেড়ে নেওয়া হলো একজন ইগো-সর্বস্ব মানুষের মিথ্যে ষড়যন্ত্রের কারণে। নরেন সেদিন বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু, ইতিহাস তো অন্য ছক কষে রেখেছিল! আজ ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, সেদিন যদি সূর্যকুমারের ওই জঘন্য ষড়যন্ত্র না থাকত, বিদ্যাসাগর যদি সেদিন নরেনকে চাকরি থেকে না তাড়াতেন, তবে কী হতো? হয়তো সংসারের মায়াজালে, অভাবের তাড়নায় আটকে পড়তেন এক সাধারণ স্কুল মাস্টার।

চাকরি যাওয়ার সেই চরম আঘাতটাই নরেন্দ্রনাথকে বাধ্য করেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে। এই ঘটনার কিছু সময় পরেই শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধি ঘটে এবং নরেন্দ্রনাথ সংসার ত্যাগ করে বরাহনগর মঠে সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নেন। মেট্রোপলিটান স্কুলের সেই বিতাড়িত মাস্টারই একদিন শিকাগোর মঞ্চ কাঁপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন গোটা বিশ্বের প্রণম্য— যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ।

ইতিহাসের এই অজানা অধ্যায়টি কি আপনাকে অবাক করল? বিদ্যাসাগরের মতো একজন প্রজ্ঞাবান মানুষের কি উচিত ছিল না একবার নরেন্দ্রনাথকে ডেকে সত্যটা যাচাই করা, আপনার কি মনে হয় ? নাকি এই পুরোটাই ছিল নিয়তির এক অদ্ভুত খেলা?

বাঙালি হিসেবে আমাদের ইতিহাসের এই অজানা সত্যিগুলো সবার জানা উচিত।

তথ্যসূত্র (References / 100% Fact-Checked):

১. যুগনায়ক বিবেকানন্দ (প্রথম খণ্ড) – স্বামী গম্ভীরানন্দ (রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন থেকে প্রকাশিত)।

২. স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী – স্বামী নিখিলানন্দ।

৩. শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ – স্বামী সারদানন্দ।

৪. সমসাময়িক মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনের ইতিহাস এবং রামকৃষ্ণ মঠের আর্কাইভাল নথিপত্র

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন