প্রথমত আইপ্যাকের কাজ যে খুব স্বচ্ছ, বিশেষ করে আর্থিক লেনদেনের, তা নয়। ফলে একদিন না একদিন তাদের তদন্তের মুখে পড়তেই হত। অন্যদিকে বাংলা দখলে গ্রাউন্ডে বিজেপি যতই পিছিয়ে যাচ্ছে, ততই এজেন্সিকে নিয়োগ করে তৃণমূল কংগ্রেসের চোখ কান কেটে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ভোটের মুখে তৃণমূলের ভোট পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক তাদের কর্মীদের ইমেল করে অফিস বন্ধ জানিয়ে দেওয়া এবং সকল কর্মীকে সরকারি ছুটি দেওয়ায় ভয়ঙ্কর অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেল তৃণমূল। তার অন্যতম কারণ, প্রার্থী বাছাই পর্ব মিটে যাওয়ার পরে, ভোটে লড়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ডাটার দরকার হয়, তার সবই আইপ্যাক এর কাছে সঞ্চিত আছে। এমনকি প্রথম দফা ভোটের যখন চার দিন বাকি এবং শিয়রে দ্বিতীয় দফার ভোট, তখন কোথায় তৃণমূলের কোন নেতা প্রচারে যাবেন থেকে শুরু করে তাঁরা কী বক্তব্য রাখবেন, পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছিল আইপ্যাক। সেই কাজে বিরাট বাধা পড়ল। এখন পুরো ব্যাপারটাই কার্যত অভিষেক ব্যানার্জির ক্যাম্যাক স্ট্রিটের অফিসকে দেখতে হবে। সেইসঙ্গে অভিষেকের আইনজীবী সঞ্জয় বসুর ফার্ম দেখবে বলে তৃণমূল সূত্রেই জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ টাকা বিলির অভিযোগ, গ্রেফতার তৃণমূল নেতা
তৃণমূলের ভোট পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকে প্রায় দুই মাস আগেই হানা দিয়েছিল ইডি। হানা দিয়েছিল অন্যতম ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের বাড়ি। যেখানে নিজে উপস্থিত হয়ে ভোটের কাজের ফাইল ছিনিয়ে এনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু তারপরেও দিল্লির চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা থেকে আরম্ভ করে পাড়ার তৃণমূল করা বাচ্চা ছেলেটাও জানে, তৃণমূল নেতৃত্ব কালীঘাট থেকে শেষ কথা বললেও, ওপর থেকে নিচে অব্দি দলীয় সংগঠন আইপ্যাক অফিস থেকে চলছে। যার ঠিকানা সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের ওয়াটার ফ্রন্ট বিল্ডিং। ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাক মমতার হয়ে ভোট পরিচালনা করছে ২০১৯ সাল থেকে। প্রশান্ত কিশোর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পরে অন্যতম ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের সঙ্গে মমতা এবং অভিষেকের যা ঘনিষ্ঠতা, সেটা পরামর্শদাতা সংস্থার ডিরেক্টরের থেকেও অনেক বেশি। দলের এক শীর্ষ নেতার এরকমই মত। আমরা দেখেছি, এবার তৃণমূলের ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে মমতার সঙ্গে অভিষেক ছাড়া মিটিং করেছিলেন একমাত্র প্রতীক। সুব্রত বক্সী রাবার স্ট্যাম্প মাত্র। আমরা সকলেই জানি, প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে কীভাবে ভোটে লড়তে হবে, এর পুরোটাই ঠিক করছেন প্রতীক এবং তাঁর সঙ্গে থাকা বিশ্বস্ত টিম। কিন্তু নয়াদিল্লিতে কয়েকদিন আগেই আইপ্যাক এর তিনজন ডিরেক্টরের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি ভিনিশ চান্দেল মানি লন্ডারিং মামলায় গ্রেফতারের পরই প্রতীক প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে যান। আইপ্যাকের তিনজন ডিরেক্টরের তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছেন ঋষি কুমার সিং। তিনিও কলকাতার বাইরে থাকেন। তাঁকেও ডেকেছে ইডি। কলকাতায় থাকতেন প্রতীক। অর্থাৎ একজন জেলে, বাকি দুইজনের উপরে ইডির নজর। কোনওমতে সেই নজর এড়িয়ে আদালতে শরণাপন্ন হয়ে নিজেকে রক্ষা করছিলেন প্রতীক। এ বছর আইপ্যাক ভোটে যে দুটি রাজ্যের কন্ট্রাক্ট পেয়েছে, তার মধ্যে একটি পশ্চিমবঙ্গ, অন্যটি তামিলনাড়ু। ডিএমকে সুপ্রিমো স্ট্যালিন যে তিনটি ভোট কুশলীসংস্থাকে নিয়োগ করেছেন, তার মধ্যে একটি হচ্ছে আইপ্যাক। মমতার দলের মুশকিল হচ্ছে, গত ৭ বছর ধরে জেলার সাংগঠনিক বিষয়গুলো পুরোপুরি আইপ্যাক নিয়ন্ত্রণ করছিল। যে কারণে কেন্দ্রীয় এজেন্সি চাপ বাড়ায় আইপ্যাকের কাজকর্মে যথেষ্ট প্রভাব পড়ছিল গত তিন মাস ধরেই। কিন্তু তবুও প্রতীক তার টিমের কর্মীদের রক্ষা করে ভোটের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বারবার আশ্বাস দিচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। সম্ভবত গ্রেফতার হতে পারেন এই আশঙ্কায় প্রতীক কোনওভাবে আগাম ব্যবস্থা নিতে চলছেন।
একটি সূত্র বলছে, তিনি নয়াদিল্লি গিয়ে বিজেপির কিছু নেতা ও আমলাকে ধরে বিষয়টি মিটমাটের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। ফলে অনেক আগু পিছু ভেবেই কার্যত অফিসটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একটি সূত্র বলছে, তিনি চাননি যে অফিসে হানা দিয়ে তার কর্মীদের কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করে নিয়ে যাক। সেটা যদি হয়, তাহলে এই সংস্থার ভবিষ্যতের উপরেই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেবে। যে কারণে কর্মীদের নিয়ে শনিবার রাতে মিটিংয়ের পরে হঠাৎ মেইল করে ১১ মে অব্দি তাঁদের ছুটি দেওয়া হয়। এবং বলে দেওয়া হয়, প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ওয়ার্ড ফ্রম হোমের মতো তাঁরা কাজ চালাতে পারেন। বিষয়টি জানাজানি হতেই তৃণমূল নেতৃত্ব প্রচন্ড অস্বস্তির মধ্যে পড়ে। এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় জানায়, এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু বিষয়টি গোপন থাকেনি কারণ একাধিক মিডিয়া আইপ্যাড সূত্রে জানতে পারে কলকাতার অধিকাংশ কর্মীকে সেবেতন ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অফিস কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এর ফলে তৃণমূল ঠিক কতটা অসুবিধায় পড়ল? কতটা অসুবিধায় পড়ল নির্বাচনী সভা থেকে মমতা নিজ মুখেই সেটা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অভিষেকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। কাউকে বেকার থাকতে দেবেন না। প্রয়োজনে দলের কাজে নেবেন। আপাতত যে সব কর্মীরা বিভিন্ন জেলা বা গুরুত্বপূর্ণ আসনের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে অভিষেকের অফিস থেকেই ভোট পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সবশেষ প্রশ্ন, বিজেপি এই কাজটা করতে গেল কেন? উত্তর দুটি। প্রথমত আইপ্যাকের কাজ যে খুব স্বচ্ছ, বিশেষ করে আর্থিক লেনদেনের, তা নয়। ফলে একদিন না একদিন তাদের তদন্তের মুখে পড়তেই হত। অন্যদিকে বাংলা দখলে গ্রাউন্ডে বিজেপি যতই পিছিয়ে যাচ্ছে, ততই এজেন্সিকে নিয়োগ করে তৃণমূল কংগ্রেসের চোখ কান কেটে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যে কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ডিসি শান্তনু বিশ্বাসের বাড়িতে আয়কর হানা হয়েছে।
রাজ্যে ভোটগ্রহণের মুখে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি-র সাঁড়াশি অভিযানের জেরে বাংলায় নিজেদের মাঠপর্যায়ের কাজ কার্যত বন্ধ করে দিল এই সংস্থা। সবটা চলবে অনলাইন। অর্থাৎ একাধিক দফতরকে আপাতত ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
সম্প্রতি আই-প্যাকের ডিরেক্টর বিনেশ চান্দেল ইডি-র হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এবং সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে বারবার তলব করার জেরে এই কৌশলগত বদল বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, গত ১৮ এপ্রিল সংস্থার পক্ষ থেকে কর্মীদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, আইনি জটিলতার কারণে আপাতত অফিসের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ রাখা হচ্ছে। কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাঁরা বাইরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখেন এবং অফিসের ইমেল আইডি ব্যবহার না করেন। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন যে, গত শনিবার থেকে আই-প্যাকের হোয়াটসঅ্যাপ মিডিয়া গ্রুপগুলিও পুরোপুরি নীরব হয়ে গিয়েছে।
চান্দেলের গ্রেফতারি ও পরবর্তী আইনি টানাপোড়েনের কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত। তবে তৃণমূলের প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের কাজ একদম বন্ধ হয়নি বলেই দাবি দলের একাংশের।
আরও পড়ুনঃ লালু-কালুদের জন্য বার্তা নিজের ভোট দিন, অন্যেরটা নয়
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য বিষয়টিকে বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছে। জোড়াফুল শিবিরের অভিযোগ, ভোটের আগে তাদের প্রচারের যন্ত্রকে পঙ্গু করে দিতেই দিল্লি থেকে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। যদিও দলের রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এই পরিস্থিতিকে খুব একটা আমল দিতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, “আমরা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল। অনেক সংস্থার সঙ্গে আমরা কাজ করি। এই সংস্থাগুলোতে অনেক কমবয়সি পেশাদাররা কাজ করেন, আমরা এমন কিছু করব না যাতে তাঁদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়। আমাদের নেত্রী জানিয়েছেন, সকলের খেয়াল রাখা হবে।” তৃণমূলের দাবি, আই-প্যাকের কাজ বন্ধ হওয়ার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
রাজ্যে ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হবে। উত্তরবঙ্গে আজ বিকেলে শেষ হচ্ছে প্রচার। ফল ঘোষণা ৪ মে। ঠিক তার আগেই আই-প্যাকের এই ডামাডোল রাজনৈতিক মহলে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সংস্থাটির একাধিক কর্মী রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ করতেন, যা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। তবে আই-প্যাক সূত্রের দাবি, বড় নির্বাচনের পর দলের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী সংখ্যা বা কাজের ধরন বদলানো নতুন কিছু নয়। কিন্তু ভোটের মাঝপথে এই ধরণের ‘রিসেট’ বা কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেওয়া অভূতপূর্ব। আপাতত ইডি-র ভয়ে মাঠ ছেড়ে ল্যাপটপেই ভরসা রাখছেন ভোটকুশলীরা।



