বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের হার নিয়ে ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমনটাই জানালেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল৷ বৃহস্পতিবার রাতে তিনি সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের হার নিশ্চিতভাবে ৯০ শতাংশের উপরে থাকবে। এটি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটছে।
বাংলায় প্রথম দফার ভোট শেষে রাত ৯টা পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান দেখে চক্ষু চড়কগাছ দুঁদে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও। একে ‘নজিরবিহীন’ বললেও হয়তো কম বলা হবে। উত্তরবঙ্গ এবং বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলার একাধিক আসনে ভোটদানের হার যা দাঁড়িয়েছে, তাকে ‘গণতন্ত্রের সুনামি’ বলছেন অনেকে। রাজ্যের অন্তত ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৬ শতাংশ বা তার বেশি!
মহিলাদের ভোটের হার পুরুষদের চেয়ে বেশি
মনোজ কুমার আগরওয়াল আরও জানান, এবারের নির্বাচনে মহিলাদের ভোটের হার পুরুষদের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, “এটি পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে যে ভোটের হার নিশ্চিতভাবে ৯০ শতাংশের উপরে যাবে। মহিলাদের ভোটের হার পুরুষদের চেয়ে বেশি।”
এই ঘোষণা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, মহিলা ভোটারদের উৎসাহ এবার স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। অনেক জেলায় মহিলারা পুরুষদের তুলনায় আগে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছেন এবং ভোট দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও সাফল্য
মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বলেন যে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলেই এই রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে মহিলাদের ভোটদানে উৎসাহিত করার জন্য নানা সচেতনতা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, রাজ্যের সব জেলায় ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ও সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন।
এবারের নির্বাচনে প্রথম দফার ভোট ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় দফার প্রস্তুতি চলছে। মনোজ কুমার আগরওয়ালের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে ভোটারদের অংশগ্রহণ এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া
বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস উভয় দলই এই উচ্চ ভোটার উপস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। বিজেপির নেতারা বলছেন, এটি জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে যে মহিলাদের উচ্চ ভোটার হার তাদের জনকল্যাণমূলক কাজের ফল।
আরও পড়ুনঃ উত্তেজনা সীমান্ত শহর হলদিবাড়িতে; গাড়িতে দ্বিতীয় ইভিএম!
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটারদের এই উৎসাহ দেখে রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে কমিশন সতর্ক করে দিয়েছে যে ভোটের পরবর্তী সময়েও শান্তি বজায় রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের অশান্তি সহ্য করা হবে না।
মুর্শিদাবাদে ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’
তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, সবথেকে বেশি ভোট পড়া ১০টি আসনের মধ্যে ৬টিই মুর্শিদাবাদ জেলার। তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভগবানগোলা, যেখানে ভোট পড়েছে অবিশ্বাস্য ৯৬.৯৫%। এর ঠিক পরেই রয়েছে রঘুনাথগঞ্জ (৯৬.৮১%)। লালগোলা, রানিনগর, ফারাক্কা এবং সামশেরগঞ্জ—মুর্শিদাবাদের এই প্রতিটি আসনেই ভোটদানের হার ৯৬ শতাংশের গণ্ডি টপকে গেছে।
উত্তরবঙ্গের দাপট
পিছিয়ে নেই উত্তরবঙ্গও। কোচবিহারের শীতলকুচি (৯৬.৪৫%) এবং শীতাই (৯৬.৪৩%) আসনেও ভোট পড়েছে রেকর্ড হারে। ময়নাগুড়ি এবং হরিরামপুরেও একই ছবি দেখা গেছে।
সবথেকে বেশি ভোট পড়া শীর্ষ ১০ আসন হল-
১ |ভগবানগোলা, মুর্শিদাবাদ। ৯৬.৯৫%
২ | রঘুনাথগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ। ৯৬.৮১%
৩ | শীতলকুচি, কোচবিহার। ৯৬.৪৫%
৪ | শীতাই, কোচবিহার। ৯৬.৪৩%
৫ |ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি। ৯৬.৩৯%
৬ | লালগোলা, মুর্শিদাবাদ। ৯৬.২০%
৭ |ফারাক্কা, মুর্শিদাবাদ। ৯৬.০৫%
৮ | সামশেরগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ। ৯৬.০৪%
৯ | রানিনগর, মুর্শিদাবাদ। ৯৬.০৩%
১০| হরিরামপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর। ৯৬.০০%
কেন এই বিপুল হার?
১. নিশ্ছিদ্র ভোটার তালিকা: আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে SIR প্রক্রিয়ায় মৃত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ায় ভোট শতাংশ স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা বেড়ে গেছে।
২. সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় সচেতনতা: মুর্শিদাবাদের আসনগুলোতে এই বিপুল হার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওই অঞ্চলের মানুষ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং মরিয়া ছিলেন।
৩. প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ:উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও তফশিলি অধ্যুষিত আসনগুলোতেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই অঙ্কে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই ৯৬ শতাংশের ‘সুনামি’ শেষ পর্যন্ত কার ঘর ভাসিয়ে দেবে আর কার পালে হাওয়া দেবে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত রাজনৈতিক মহল। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—২০২৬-এর প্রথম দফার ভোট বাংলার ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে থেকে যাবে।
আরও পড়ুনঃ নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙল বাংলা, নজির গড়ল পশ্চিমবঙ্গ
তাৎপর্য কী?
এবারের নির্বাচনে ৯০ শতাংশের উপরে ভোটার উপস্থিতি এবং মহিলাদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়া রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা, রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই সচেতন। নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি এবং বিভিন্ন দলের প্রচারের ফলে ভোটাররা উৎসাহিত হয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছেন।
মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়ালের এই ঘোষণা রাজ্যের সব ভোটারকে আরও উৎসাহিত করবে। এখন দেখার বিষয়, দ্বিতীয় দফার ভোটে এই উচ্চ হার আরও বজায় থাকে কি না।
রাজ্যের মানুষ এখন অপেক্ষায় রয়েছেন যে এই রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলে। নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্য দেখিয়ে দিচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র এবার আরও জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে।



