Monday, 27 April, 2026
27 April
Homeসমস্তDemocracy: এক দলের আধিপত্য রাষ্ট্রের জন্যে কতটা খারাপ?

Democracy: এক দলের আধিপত্য রাষ্ট্রের জন্যে কতটা খারাপ?

গণতন্ত্র কোনো উপহার নয় যা একবার পেয়ে গেলে চিরকাল থেকে যাবে। একে প্রতিদিন অর্জন করতে হয়।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটা কেবল ব্যালট পেপার বা ইভিএম মেশিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তুমি যদি গত কয়েক দশকের ভারতের রাজনীতির দিকে তাকাও, তবে দেখবে যে এক সময় কংগ্রেসের যে আধিপত্য ছিল, আজ তা এক নতুন এবং আরও শক্তিশালী রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু এই নতুন আধিপত্য কেবল ভোট জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক স্তম্ভ বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।

এই আধিপত্যের রাজনীতি বুঝতে গেলে তোমাকে প্রথমে ক্ষমতার বিন্যাসটা বুঝতে হবে। গণতন্ত্র চলে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ (Checks and Balances) বা ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর। যখন একটি দল বা একজন নেতা পাহাড়প্রমাণ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তখন সেই ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমান ভারতবর্ষে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে ‘এক দেশ, এক দল’—এই অলিখিত নিয়মটি কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।

তুমি হয়তো লক্ষ্য করেছ, গত কয়েক বছরে খবরের কাগজে বা নিউজ চ্যানেলে সবচেয়ে বেশি যে নামগুলো শোনা যায়, তা হলো সিবিআই (CBI) বা ইডি (ED)।

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে লোডশেডিং

এক সময় এই সংস্থাগুলোর কাজ ছিল দেশের বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি বা অপরাধ দমন করা। কিন্তু আজ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে এই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো যেন শাসকদলের এক একটি ‘অঘোষিত রাজনৈতিক উইং’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর কার্যপদ্ধতিটা একটু তলিয়ে দেখলে তুমি বুঝতে পারবে এটা কতটা ভয়ংকর। বিরোধী দলের কোনো নেতা যখনই সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে শুরু করেন বা নির্বাচনী লড়াইয়ে শাসকদলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান, তখনই তাঁর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে এই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো। মজার বিষয় হলো, ওই একই নেতা যদি দল পরিবর্তন করে শাসকদলে যোগ দেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত তদন্ত জাদুর মতো ভ্যানিশ কুমার হয়ে যায়। একেই সাধারণ মানুষ আজ বিদ্রুপ করে বলছে ‘ওয়াশিং মেশিন পলিটিক্স’।

সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো PMLA (Prevention of Money Laundering Act) বা অর্থ পাচার বিরোধী আইন। এই আইনের বর্তমান সংশোধনীর ফলে ইডির ক্ষমতা আকাশচুম্বী হয়েছে। এখানে ‘প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’—এই চিরাচরিত বিচারব্যবস্থা কাজ করে না।

বরং এখানে অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হয় যে তিনি নির্দোষ। ফলে চার্জশিট পেশ না করেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বিরোধী নেতাদের জেলে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে। তুমি কি জানো, ইডি-র মামলার কনভিকশন রেট বা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার কত কম? মাত্র ০.৫% থেকে ৮%!

অর্থাৎ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষ হয় না, স্রেফ বিচারের প্রক্রিয়াটাকেই শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয় যাতে বিরোধীরা নির্বাচনী ময়দান থেকে ছিটকে যায়।

এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। নির্বাচন কমিশনের মতো সংসংস্থাকে যখন সরাসরি সরকারের ইচ্ছাধীন লোক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের ভোটের পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

বিশেষ করে ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি কীভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন বা বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় (যেমন পশ্চিমবঙ্গের বিশাল পরিমাণ নাম বাদ যাওয়া) একধরণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত আক্রমণ যাতে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।

এর পাশাপাশি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর পরিকল্পিত আঘাত। ভারতবর্ষ কোনো একক দেশ নয়, এটি হলো ‘রাজ্যসমূহের ইউনিয়ন’। আমাদের সংবিধান প্রতিটি রাজ্যকে নিজস্ব ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান একদলীয় আধিপত্যের যুগে ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন, ওয়ান এভরিথিং’—এই স্লোগান যেন যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বা ফেডারেলিজমের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।

তুমি যদি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির দিকে তাকাও, তবে দেখবে কীভাবে রাজভবনের পদটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজ্যপাল হওয়ার কথা ছিল কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে এক সেতুবন্ধনকারী, কিন্তু আজ তাঁরা হয়ে উঠেছেন রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের প্রতিপক্ষ।

বিল আটকে রাখা, উপাচার্য নিয়োগে বাধা দেওয়া বা প্রতিনিয়ত নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর কাজে হস্তক্ষেপ করা আজ এক সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

(এমন নয় যে রাজ্যের শাসক দল ধোয়া তুলসী পাতা তবে আমরা তো এটা দেখছি যে কিভাবে রাজভবন থুড়ি লোকভবহন কে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে আজকাল)

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক অবরোধ। জিএসটি (GST) চালু হওয়ার পর রাজ্যগুলোর নিজস্ব আয় কমেছে। কেন্দ্র এখন রাজ্যগুলোর পাওনা টাকা আটকে রেখে তাদের কার্যত ভিখারিতে পরিণত করতে চাইছে। ১০০ দিনের কাজ বা আবাস যোজনার টাকা রাজনৈতিক কারণে আটকে রাখা মানে কেবল সরকারের বিরোধিতা করা নয়, বরং সেই রাজ্যের সাধারণ গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা। সেটা তুমি মানো আর না মানো।

প্রতিষ্ঠানের এই অবক্ষয় যখন পূর্ণতা পায়, তখন পরবর্তী ধাপ হয় জনমতের কণ্ঠরোধ। তুমি যদি আজকের মূলধারার নিউজ চ্যানেলগুলোর দিকে তাকাও, তবে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করবে। সেখানে জনগণের সমস্যা, বেকারত্ব বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আলোচনার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করা হয় শাসকদলের গুণগানে অথবা বিরোধীদের চরিত্রহননে।

প্রশ্ন করা হয়, আপনি সকালে কী খেয়েছেন, শান্তি করে পেট পরিষ্কার হয়েছে কিনা, এতো মনের জোর কোথা থেকে আসে ইত্যাদি।

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যম আজ কীভাবে তার মেরুদণ্ড হারিয়েছে, তা বোঝার জন্য তোমাকে এই কর্পোরেট-রাজনীতি আঁতাতটা বুঝতে হবে।

বড় বড় কর্পোরেট গোষ্ঠী, যাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ সরাসরি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, তারাই আজ দেশের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রক। যখন সংবাদপত্রের মালিক বা চ্যানেলের প্রমোটর সরকারের থেকে বড় বড় ঠিকা বা সুবিধা পায়, তখন সেই চ্যানেল থেকে সরকারের সমালোচনা আশা করা বৃথা। একে আমরা সহজ ভাষায় বলছি ‘গদি মিডিয়া’।

এদের কাজ হলো সরকারের ভুলগুলো আড়াল করা এবং এমন এক কাল্পনিক জগত তৈরি করা যেখানে মনে হবে দেশে কোনো সমস্যাই নেই। সাংবাদিকতার প্রাথমিক ধর্ম হলো ‘ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা’, কিন্তু আজ সেই প্রশ্ন করার জায়গাটি দখল করেছে ‘ভজন করা’। যারা সাহস দেখিয়ে সত্যিটা বলার চেষ্টা করছেন, তাদের হয় চাকরি হারাতে হচ্ছে, না হয় তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে।

তুমি হয়তো ভাবছ, মূলধারার মিডিয়া বিক্রি হয়ে গেলেও ইউটিউব, ফেসবুক বা এক্স-এর (টুইটার) মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তো আমরা সত্যিটা জানতে পারছি। কিন্তু দুঃসংবাদ হলো, এই স্বাধীন কণ্ঠগুলোকেও স্তব্ধ করার জন্য সরকার একের পর এক আইন নিয়ে আসছে।

২০২১ সালে শুরু হওয়া IT Rules বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনকে ২০২৬ সালে এসে আরও কঠোর করা হয়েছে। এখন সরকারের নিজস্ব ‘ফ্যাক্ট-চেক ইউনিট’ আছে। মজার বিষয় হলো, সরকার নিজেই ঠিক করবে কোন খবরটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা। যদি সরকার মনে করে তোমার কোনো পোস্ট বা ভিডিও তাদের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে, তবে কোনো নোটিশ ছাড়াই সেই কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলার বা তোমার অ্যাকাউন্ট ব্লক করার ক্ষমতা আজ তাদের হাতে আছে।

এমনকি নতুন ব্রডকাস্ট সার্ভিসেস বিল-এর মাধ্যমে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউটিউবার বা ডিজিটাল সাংবাদিকদেরও লাইসেন্স নিতে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ, তুমি যদি ঘরে বসে একটি ল্যাপটপ আর ক্যামেরা নিয়ে সরকারের দুর্নীতির কথা বলো, তবে তোমাকেও টেলিভিশন চ্যানেলের মতো কঠোর নিয়মের বেড়াজালে আটকে দেওয়া হবে।

এর উদ্দেশ্য একটাই—তথ্য যেন কেবল একতরফাভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে UAPA বা বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন। এই আইনটি মূলত সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু আজ এটি ব্যবহার করা হচ্ছে ছাত্র, অধ্যাপক, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে।

তুমি কি জানো, এই আইনের অধীনে কাউকে গ্রেপ্তার করলে বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা যায়? চার্জশিট দাখিল না করেই দিনের পর দিন বন্দি থাকা এবং জামিন পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠা—এই প্রক্রিয়াটাই এখন ভিন্নমতাবলম্বীদের শায়েস্তা করার প্রধান অস্ত্র।

যখন মানুষ দেখে যে সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হবে, তখন সমাজে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। একেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন ‘চিলিং এফেক্ট’। অর্থাৎ, শাস্তির ভয়ে মানুষ নিজে থেকেই কথা বলা বন্ধ করে দেয়।

এর পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি আজ চরমে পৌঁছেছে। তোমার স্মার্টফোনটি কি আসলেই নিরাপদ? নতুন ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট-এ রাষ্ট্রকে এমন কিছু বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সরকার যে কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যে উঁকি দিতে পারে। তোমার চ্যাট, তোমার সার্চ হিস্ট্রি—সবকিছুই এখন রাষ্ট্রের নজরদারির আওতায়।

যখন তুমি জানবে যে কেউ তোমাকে সবসময় দেখছে, তখন তোমার স্বাভাবিক চিন্তা এবং প্রতিবাদের ভাষা বদলে যেতে বাধ্য। এই নজরদারি আর সেন্সরশিপের মাধ্যমে একটি সমান্তরাল বাস্তব তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের আসল সমস্যাগুলো আলোচনার বাইরে চলে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের দখল আর মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করার পর যে চূড়ান্ত অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়, তা হলো সামাজিক বিভাজন। তুমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াও, তুমি নিজেকে একজন ভারতীয় হিসেবে দেখো। কিন্তু একদলীয় আধিপত্যের এই নতুন যুগে রাষ্ট্র তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চায় যে তুমি সবার আগে একজন হিন্দু, মুসলমান, দলিত বা উচ্চবর্ণের প্রতিনিধি।

এই বিভাজনের রাজনীতিই হলো বর্তমান আধিপত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী জ্বালানি। দেশের ‘ফ্যাব্রিক’ বা বুননটা আসলে তৈরি হয়েছিল বহুত্ববাদ দিয়ে—যেখানে ধর্ম যার যার, কিন্তু দেশ সবার। আজ সেই বুননটাকেই ছিঁড়ে ফেলার এক পরিকল্পিত চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

তুমি লক্ষ্য করেছ কি, কেন নির্বাচনের ঠিক আগেই সাম্প্রদায়িক ইস্যুগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে? কারণ, যখন উন্নয়ন, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সরকারের ব্যর্থতাগুলো সামনে চলে আসে। কিন্তু যখনই আলোচনাটা ‘হিন্দু বিপন্ন’ বনাম ‘মুসলিম তোষণ’-এ পরিণত হয়, তখন মানুষের যুক্তি ঢাকা পড়ে যায় আবেগের চাদরে। ধর্মীয় মেরুকরণ এখন আর কেবল ভাষণে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন আমাদের প্রতিদিনের যাপনে ঢুকে গেছে।

খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, এমনকি প্রেম-ভালোবাসাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যখন দেশের একটি বিশাল অংশকে (সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে) প্রতিনিয়ত ‘শত্রু’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সেই দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি চিরতরে বিঘ্নিত হয়। তুমি যদি খেয়াল করো, এই ঘৃণার রাজনীতি কিন্তু কেবল সংখ্যালঘুদের ক্ষতি করছে না, এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মধ্যেও এক অস্থিরতা ও ভয়ের জন্ম দিচ্ছে। ঘৃণা কখনো উন্নয়ন আনতে পারে না, তা কেবল ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে।

এর ভেতরে রয়েছে এক সূক্ষ্ম জাতপাতের রাজনীতি। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘নিউ সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। হিন্দুত্বের বড় ছাতার তলায় উচ্চবর্ণের আধিপত্য বজায় রেখেও দলিত বা ওবিসি (OBC) ভোটব্যাঙ্ককে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ফেলা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তর ভারতের দিকে তাকালে দেখবে, কীভাবে রাজবংশী, মতুয়া বা তফশিলি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে আলাদা আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলে তাদের একে অপরের প্রতিপক্ষ বানিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে আসল লাভ কার? আসল লাভ সেই আধিপত্যকামী শক্তির, যারা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতিতে বিশ্বাসী। যখন সমাজ এভাবে শতধা বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা আর ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের কাছে নিজেদের অধিকারের দাবি জানাতে পারে না।

আরও পড়ুনঃ কমিশনের নজরে ডায়মন্ড হারবার, সাসপেন্ড IPS-সহ ৫ পুলিশ কর্তা

আমাদের সংবিধানের স্থপতি ড. বি.আর. আম্বেদকর গণপরিষদের শেষ ভাষণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “রাজনৈতিক গণতন্ত্র ততক্ষণ স্থায়ী হবে না, যতক্ষণ না তার মূলে সামাজিক গণতন্ত্র থাকে।” আজ সেই সামাজিক গণতন্ত্রই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে। ভারতের সংবিধানের একটি ‘মৌলিক কাঠামো’ বা Basic Structure আছে, যার মধ্যে পড়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং বিচারবিভাগের স্বাধীনতা।

কিন্তু একদলীয় আধিপত্য যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তারা এই মৌলিক কাঠামোটাকেই বদলে দিতে চায়। সংবিধানকে সরাসরি পরিবর্তন না করেও, তার ভেতরের নির্যাসটুকুকে বের করে নেওয়া হচ্ছে। যখন সংসদীয় বিতর্কের সুযোগ থাকে না, যখন বিরোধীদের কণ্ঠস্বর রেকর্ড থেকে মুছে ফেলা হয়, যখন বিচারবিভাগ সরকারের প্রতি নমনীয় হয়ে পড়ে, তখন সংবিধান হয়ে যায় কেবল একটি বই।

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন মানেই কি গণতন্ত্র? না। গণতন্ত্র মানে হলো সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর সহাবস্থান এবং বিরোধীদের সম্মানের সাথে জায়গা দেওয়া। আধিপত্যকামী শক্তি যখন মনে করে যে তারাই একমাত্র ‘দেশপ্রেমিক’ এবং বাকি সবাই ‘দেশদ্রোহী’, তখন গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘণ্টা বেজে ওঠে। ভারতের আসল শক্তি ছিল তার বৈচিত্র্য। সেই বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে এক ছাঁচে সবাইকে ঢালার চেষ্টা ভারতের অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলছে। আজ যে শাসন চলছে, তা হয়তো চিরকাল থাকবে না—ইতিহাস সাক্ষী আছে কোনো আধিপত্যই চিরস্থায়ী হয় না। কিন্তু এই সময়ে আমাদের সমাজ ও সংবিধানের যে ক্ষতিটা হচ্ছে, তা মেরামত করতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

সাধারণ নাগরিক হিসেবে তোমার বা আমার করার কী আছে? উত্তরটা খুব সহজ। গণতন্ত্র কোনো উপহার নয় যা একবার পেয়ে গেলে চিরকাল থেকে যাবে। একে প্রতিদিন অর্জন করতে হয়। একদলীয় আধিপত্য তখনই সফল হয় যখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। যখন আমরা দুর্নীতির চেয়েও ধর্মকে বেশি গুরুত্ব দিই, যখন আমরা খবরের সত্যতা যাচাই না করেই হোয়াটসঅ্যাপ প্রোপাগান্ডা বিশ্বাস করি, তখনই আমরা আমাদের দেশের ‘ফ্যাব্রিক’ বা বুননটাকে দুর্বল করি। সংবিধান আমাদের যে অধিকার দিয়েছে, তা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন সরাসরি তোমার এবং আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের ওপর। নীরবতাই হলো স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই কথা বলো, প্রশ্ন তোলো, এবং মনে রেখো—ভারতবর্ষ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতের নয়, এটি আমাদের সবার।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন