মুম্বাইয়ের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত সঞ্জয় গান্ধী জাতীয় উদ্যান (SGNP) বর্তমানে এক নজিরবিহীন বিতর্কের কেন্দ্রে। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে পার্ক কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থী এবং প্রাতঃভ্রমণকারীদের জন্য যে নতুন ট্যারিফ চার্ট ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে জনমানসে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাতঃভ্রমণকারীদের বা ‘প্রভাত ফেরি’র বার্ষিক ফি এক ধাক্কায় প্রায় ২৮ গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে বড়সড় আঘাত হেনেছে।
আরও পড়ুনঃ গোলকধাঁধা, দিল্লির দাদাগিরি নাকি দিদির দুর্গ? বাংলার মসনদ কার?
প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, সাধারণ প্রাতঃভ্রমণকারীদের জন্য বার্ষিক পাসের মূল্য ৩৪৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিয়ে এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,০০০ টাকা। যারা এককালীন এত বড় অংক দিতে পারবেন না, তাদের জন্য মাসিক ১,০০০ টাকা (সাধারণ) এবং ৫০০ টাকার (প্রবীণ) বিকল্প রাখা হয়েছে। কিন্তু শতাংশের হিসেবে এই বৃদ্ধি এতটাই যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি ‘তুঘলকি সিদ্ধান্ত’ ছাড়া আর কিছুই নয়। বোরিভালি, কান্দিভালি এবং দহিসরের মতো সংলগ্ন শহরতলি থেকে আসা কয়েক হাজার মানুষ যারা কয়েক দশক ধরে এই অরণ্যের শান্ত পরিবেশে দিন শুরু করেন, তাদের কাছে এই অরণ্য এখন আক্ষরিক অর্থেই এক বিলাসিতায় পরিণত হতে চলেছে।
শুধুমাত্র প্রাতঃভ্রমণকারী নয়, পর্যটকদের বিনোদনের ক্ষেত্রেও খরচের বোঝা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। পার্কে অত্যন্ত জনপ্রিয় লায়ন এবং টাইগার সাফারির টিকিটের দাম ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে, বন রানি নামক মিনি ট্রেনের আনন্দ উপভোগ করতে এখন ১০০ টাকার বদলে গুনতে হবে ৩০০ টাকা। এমনকি কানহেরি গুহা পর্যন্ত যাতায়াতের বাস ভাড়াও ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সঞ্জয় গান্ধী জাতীয় উদ্যানে সময় কাটানো এখন পকেটে বড়সড় টান দেওয়ার সামিল।
পার্ক কর্তৃপক্ষের যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। তাদের মতে, প্রতিদিন পার্কে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ প্রাতঃভ্রমণকারীর পদচারণা ঘটে। এই বিপুল জনসমাগম সামলানো এবং অরণ্যের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করার জন্য পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের দাবি, সংগৃহীত এই অতিরিক্ত অর্থ নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা বৃদ্ধি, শৌচাগার সংস্কার, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং বিশেষ করে কানহেরি গুহা পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হবে। এছাড়া অবৈধ প্রবেশ রুখতে কিছু অননুমোদিত গেট বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে, যাতে সমস্ত পর্যটক মূল প্রবেশপথ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রবেশ করেন।
আরও পড়ুনঃ সকালে বহুতলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড; ন’জনের ঝলসে মৃত্যু
তবে এই পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিকে আমল দিতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, ফি বহুগুণ বাড়ানো হলেও পার্কের পরিষেবা এখনও তথৈবচ। নিয়মিত দর্শনার্থীদের মতে, পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব, অপর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার ঢিলেঢালা ভাব এখনও চোখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (CSR) থেকে পাওয়া অর্থে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়, সেক্ষেত্রে কেন সাধারণ মানুষের ওপর এই চড়া করের বোঝা চাপানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
এই গণবিক্ষোভের মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ আপাতত প্রাতঃভ্রমণকারীদের ফির প্রস্তাবটি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। মে মাসের শুরুতে সঞ্জয় গান্ধী জাতীয় উদ্যানের অধিকর্তা অনিতা পাতিল জানিয়েছেন যে, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কারণে এই ফি বৃদ্ধি আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। তবে সাফারী বা ট্রেনের টিকিটের বর্ধিত দাম বহাল থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এই টানাপোড়েন আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, সংরক্ষণ ও আধুনিকীকরণের দোহাই দিয়ে পাবলিক স্পেস বা জনপরিসরকে যখন বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও চাহিদার সাথে প্রশাসনের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্তের পকেট না প্রশাসনের আধুনিকীকরণ— কার জয় হবে, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।


