২০২৬-এর এপ্রিল। বাংলার আকাশে তখন চৈত্র শেষের তপ্ত রোদ আর রাজনৈতিক মহলে যুদ্ধের দামামা। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই সময়টা যখন ফিরে আসে, গঙ্গার ধারের এই রাজ্যটা যেন এক বিচিত্র অস্থিরতায় ভোগে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে যা ঘটল, তা কেবল রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বা ভোট শতাংশের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। এবারের লড়াই সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিল পর্দার আড়ালে থাকা সেই সব মস্তিস্কদের কাছে, যারা আধুনিক রণকৌশলে ভোট সাজান। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আচমকাই এসে পড়লেন আই-প্যাক-এর অন্যতম ডিরেক্টর বিনেশ চন্দেল।
আপনি যদি সেই তপ্ত দুপুরের কথা ভাবেন, যখন সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের কাঁচঘেরা কর্পোরেট অফিসগুলো প্রতিদিনের মতো ব্যস্ত ছিল, ঠিক তখনই এক থমথমে নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছিল আই-প্যাকের সদর দপ্তরকে। দিনটা ছিল ১৩ই এপ্রিল। হাতে মাত্র কয়েকদিন, তারপরই বাংলায় প্রথম দফার ভোট। আর ঠিক সেই সময়েই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র আধিকারিকরা যখন ঝড়ের গতিতে সেই দপ্তরে ঢুকলেন, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এই তল্লাশি শেষ হবে একজনের হাতকড়া পরার মধ্য দিয়ে। বিনেশ চন্দেলকে যখন দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেপ্তার করা হলো, তখন বাংলার রাজনীতিতে একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল।
আপনি হয়তো ভাবছেন, একজন রাজনৈতিক পরামর্শদাতার অপরাধ কী হতে পারে? ইডির অভিযোগ ছিল মারাত্মক। কয়লা পাচার মামলা থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অর্থপাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের ছায়া দেখা যাচ্ছিল তাদের নথিতে। দাবি করা হলো, আই-প্যাকের এই ডিরেক্টর এমন এক জাল বিছিয়েছেন যেখানে হাওয়ালা চ্যানেলের মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা পাচার হয়েছে এক সংস্থায়। যে মানুষটা ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডেটা অ্যানালিটিক্স আর গ্রাফ দেখে নির্বাচনী প্রচারের নীল নকশা তৈরি করতেন, তাঁর নাম হঠাৎ জড়িয়ে গেল কয়লা মাফিয়া আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারবারিদের সাথে। এই বৈপরীত্যই সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর সংশয় আর ভয়ের জন্ম দিয়েছিল।
বিনেশের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই কলকাতার রাজপথের উত্তাপ যেন আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। কালীঘাটের অন্দরমহল থেকে নবান্ন—সব জায়গাতেই এই ঘটনাকে দেখা হলো ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সরব হলেন, তখন পরিষ্কার হয়ে গেল যে এই যুদ্ধটা আর আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। আই-প্যাকের মতো সংস্থাকে অকেজো করে দেওয়া মানে হলো জোড়াফুলের প্রচারের মেরুদণ্ডকে ধাক্কা দেওয়া—অন্তত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত ছিল সেটাই। কিন্তু সেই বড় রাজনীতির দাবার চালে আটকা পড়ে গেলেন একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, যাঁর জীবনটা রাতারাতি বদলে গেল গারদের ওপারে।
আরও পড়ুনঃ ‘পুলিশের শরীরী ভাষা বদলেছে, তারা করে দেখানোর সুযোগ চাইছে
আপনি যদি সেই সময়ের বিনেশের পরিস্থিতির দিকে তাকান, দেখবে্ন সেখানে আইন আর রাজনীতির এক অদ্ভুত মিশেল ঘটেছিল। প্রেসিডেন্সি জেল বা ইডির লকআপে কাটানো সেই রাতগুলো নিশ্চয়ই সাধারণ কোনো অপরাধীর রাতের মতো ছিল না। একদিকে যখন বাইরে ভোটের স্লোগান উঠছে, মানুষ বুথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ভেতরে বিনেশ লড়ছিলেন এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে। অভিযোগের পাহাড় তাঁর সামনে, কিন্তু সেই পাহাড়ের কোনো প্রমাণ তখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ইডির দাবি ছিল যে তাঁর কাছে এমন কিছু তথ্য আছে যা এই পাচার চক্রের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কিন্তু দিনের পর দিন জিজ্ঞাসাবাদ চললেও সেই ‘ধামাকা’ আর সামনে এল না।
আশ্চর্য বিষয় হলো, এই গোটা ঘটনার টাইমিং। নির্বাচন শুরু হওয়ার ঠিক আগে গ্রেপ্তার আর তারপর একের পর এক দফার ভোট চলাকালীন বিনেশের জামিনের আবেদন খারিজ হওয়া—সবটাই যেন এক সুপরিকল্পিত চিত্রনাট্যের অংশ বলে মনে হচ্ছিল। তুমি একবার কল্পনা করো সেই মায়ের কথা, যাঁর কথা বিনেশ বার বার আদালতের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। ছেলের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা সেই বৃদ্ধার অসহায়তা যখন বিচারকের এজলাসে পেশ করা হলো, তখন ইডি কঠোরভাবে তার বিরোধিতা করেছিল। ইডি-র যুক্তি ছিল, বিনেশ বাইরে বেরোলে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হতে পারে। কিন্তু যে তথ্যের কথা বলা হচ্ছিল, তা কি সত্যিই বিনেশের কাছে ছিল, নাকি তিনি ছিলেন স্রেফ এক বড় চালের দাবার ঘুঁটি?
সল্টলেকের সেই অফিসের কাঁচের দেওয়ালগুলোতে এখন আর শুধু রাজনীতির সমীকরণ লেখা থাকে না, সেখানে লেখা থাকে এক অনিশ্চয়তার ইতিহাস। বিনেশ চন্দেলের এই গ্রেপ্তারি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে ক্ষমতার লড়াই যখন তুঙ্গে ওঠে, তখন ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার বা পেশাদারিত্বের কোনো দাম থাকে না। আইন তখন হয়ে ওঠে শাসনের অস্ত্র। তুমি দেখবে, এই প্রথম অংশের ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটা কেবল এক ব্যক্তির কারাবাস ছিল না, এটা ছিল এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অন্য এক ব্যবস্থার পেশি প্রদর্শনী। আর এই পেশি প্রদর্শনীর মাঝখানে বিনেশ চন্দেল হয়ে উঠলেন এমন এক চরিত্র, যাঁকে দিয়ে হয়তো অনেক বড় কোনো বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছিল দিল্লি।
কিন্তু নাটক তো তখনও বাকি ছিল। জামিনের লড়াই যখন তুঙ্গে, যখন সবাই ধরে নিয়েছে যে ভোট না মেটা পর্যন্ত বিনেশকে মুক্ত আকাশ দেখতে দেওয়া হবে না, ঠিক তখনই এমন কিছু ঘটল যা সারা দেশের আইনি বিশেষজ্ঞদের চমকে দিল। সেই বিস্ময়কর মোড় এবং পিএমএলএ আইনের যে কঠিন জাল বিনেশকে জড়িয়ে ধরেছিল, তা নিয়েই আমরা কথা বলব দ্বিতীয় অংশে। আপাতত এটুকুই ভাবো, যে মানুষটা ভোট জেতানোর কারিগর ছিলেন, তিনি নিজেই জীবনের সবচেয়ে বড় হার-জিতের লড়াইয়ে তখন একা দাঁড়িয়ে।
প্রথম দফার ভোট মিটে দ্বিতীয় দফাও পার হয়ে গেল। বিনেশ চন্দেল তখনও গারদের ওপারে। আপনি যদি ভারতের বিচারব্যবস্থার দিকে তাকান, দেখবেন সাধারণ ফৌজদারি মামলায় জামিন পাওয়া যতটা সহজ, পিএমএলএ (PMLA) বা ‘প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট’-এর ক্ষেত্রে তা ঠিক ততটাই দুঃসাধ্য। এই আইনটি যেন এক মাকড়সার জাল—একবার কেউ এর ভেতরে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথটি আইনপ্রণেতারা অত্যন্ত সরু করে রেখেছেন। বিনেশের লড়াইটা তাই কেবল ইডির বিরুদ্ধে ছিল না, লড়াইটা ছিল এই আইনের সেই কুখ্যাত ‘টুইন কন্ডিশনস’ বা দুটি কঠিন শর্তের বিরুদ্ধে।
আপনি কি জানেন এই আইনের সবচেয়ে ভীতিপ্রদ দিকটি কী? সাধারণ আইনে নিয়ম হলো, যতক্ষণ না দোষ প্রমাণ হচ্ছে ততক্ষণ আপনি নির্দোষ। কিন্তু পিএমএলএ-র ৪৫ নম্বর ধারা এই ধারণাটিকে পুরো উল্টে দেয়। এখানে জামিন পেতে হলে বিচারককে দুটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে হয়: প্রথমত, অভিযুক্ত যে দোষী নন তার যথেষ্ট কারণ আছে এবং দ্বিতীয়ত, জামিনে থাকাকালীন তিনি আর কোনো অপরাধ করবেন না। অর্থাৎ, বিচার শুরু হওয়ার আগেই আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি ধোয়া তুলসী পাতা। এই আইনি মারপ্যাঁচেই বিনেশ চন্দেলের মুক্তির পথ মাসের পর মাস আটকে ছিল।
কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিকে এসে দৃশ্যপট হঠাৎ বদলাতে শুরু করল। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, ২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত ইডির সুর ছিল অত্যন্ত চড়া। বিনেশ যখন তাঁর অসুস্থ মায়ের সেবার জন্য মানবিকতার খাতিরে অন্তর্বর্তী জামিন চাইলেন, ইডি তখনও আদালতে দাঁড়িয়ে কড়া ভাষায় তার বিরোধিতা করল। তাদের দাবি ছিল, তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে এবং এই সময়ে বিনেশ বাইরে এলে গোটা অপারেশন ভেস্তে যেতে পারে। আদালত ইডির সেই যুক্তি মেনে নিয়ে বিনেশের আবেদন খারিজ করে দিল। সেই রাতে জেলখানায় বসে বিনেশ সম্ভবত ভাবছিলেন যে ভোট না মেটা পর্যন্ত তাঁর আর বাইরের পৃথিবী দেখা হবে না।
কিন্তু ঠিক দুদিন পর, ৩০শে এপ্রিল দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে যা ঘটল, তাকে অলৌকিক বললেও কম বলা হয়। যে ইডি দুদিন আগেও এক চুল জমি ছাড়তে নারাজ ছিল, তারা হঠাৎ সুর নরম করে আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বলল—”আমাদের কোনো আপত্তি নেই।” কোনো শর্ত নেই, কোনো জোরালো যুক্তি নেই, স্রেফ ‘নো অবজেকশন’। তুমি একবার ভেবে দেখো, যে মামলার তদন্তের স্বার্থে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচনের মুখে গ্রেপ্তার করা হলো, সেই মামলার তদন্ত কি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে এমন জায়গায় পৌঁছে গেল যে হঠাৎ করেই সেই ব্যক্তি ‘নিরাপদ’ হয়ে উঠলেন? নাকি রাজনৈতিক বাতাবরণে পর্দার আড়ালে কোনো অলিখিত সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল?
আরও পড়ুনঃ শেষ চেষ্টা! ভোটের গণনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে তৃণমূল
বিচারক অমিত বনসল যখন দেখলেন খোদ তদন্তকারী সংস্থাই আপত্তি তুলছে না, তখন তাঁর সামনে পথ খোলা ছিল মাত্র একটিই। তিনি স্পষ্টই জানালেন, যেহেতু ইডি আপত্তি করছে না, তাই পিএমএলএ-র সেই ভয়ংকর ‘টুইন কন্ডিশনস’ প্রয়োগ করার আর প্রয়োজন নেই। ৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড আর দুজন জামিনদারের বিনিময়ে বিনেশ চন্দেল পেলেন মুক্তির স্বাদ। কিন্তু এই মুক্তি কি কেবলই আইনের জয়, নাকি সময়ের জয়? তুমি যদি ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাও, দেখবে বাংলার নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দফাগুলো ততক্ষণে মিটে গিয়েছে। যে আই-প্যাককে ধাক্কা দেওয়ার কথা উঠেছিল, তাদের কর্মক্ষমতা ততদিনে যা প্রভাব ফেলার ফেলে দিয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকে পিএমএলএ আইন নিয়ে প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। এই আইন কি তবে কেবল কাউকে আটকে রাখার জন্য এক রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? আপনি দেখবেন, বিনেশের মতো একজন উচ্চশিক্ষিত পেশাদার ব্যক্তিকে যেভাবে অর্থপাচারের অভিযোগে তিল তিল করে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হলো, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ফল কিন্তু তদন্তে মেলেনি। ৫০ কোটি টাকার সেই কাল্পনিক খতিয়ান কি শেষ পর্যন্ত শুধুই কাগজের নৌকা হয়ে থেকে যাবে? ইডির এই হঠাৎ সুর বদল সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর সংশয় তৈরি করে দিল—তদন্তের চেয়েও বড় কি তবে রাজনীতির কারসাজি?
আপনি যখন আজ এই ঘটনার ব্যবচ্ছেদ করবেন, দেখবেন বিনেশ চন্দেল হয়তো জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর পেশাদার জীবনে যে দাগটা লেগে গেল, তা মুছতে অনেক সময় লাগবে। সেই ১৫ দিন তাঁর জন্য কেবল ব্যক্তিগত লড়াই ছিল না, তা ছিল দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। কেন ভোটের সময়ই গ্রেপ্তার হতে হলো? আর কেনই বা ভোটের পর এমন ম্যাজিকের মতো ইডি পিছু হঠল? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো আইনি বইতে লেখা নেই।
একটা কথাই মনে হয়—বিনেশ চন্দেল হয়তো এক বড় ষড়যন্ত্রের ছোট এক অংশ মাত্র। কিন্তু তাঁর এই লড়াই প্রমাণ করে দিল যে আইনের চোখে সবাই সমান হলেও, রাজনৈতিক মরশুমে আইনের চোখ মাঝে মাঝে অন্য কারোর হাতের ইশারায় পরিচালিত হয়। আপনি আজ যখন সেই সল্টলেকের অফিসের দিকে তাকাবেন, দেখবেন আলো জ্বলছে, কাজ চলছে, কিন্তু সেই কাঁচের দেওয়ালে এখনও এক অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে। বিনেশ চন্দেল আজ মুক্ত, কিন্তু ক্ষমতার সেই নির্মম খেলার স্মৃতি হয়তো কোনোদিন মুছবে না। এই সমাজ, এই রাজনীতি আর এই বিচারব্যবস্থা কি শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারবে? প্রশ্নটা থেকেই যায়।


