পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি আর তার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে বর্তমানে ভারতের আকাশপথের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
ভারতের প্রধান তিন বিমান সংস্থা—এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো এবং স্পাইসজেট—একযোগে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ‘এসওএস’ (SOS) বার্তা পাঠিয়েছে। তাদের সাফ কথা, যদি অবিলম্বে এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা এটিএফ (ATF)-এর আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে খুব শীঘ্রই দেশের বিমান পরিষেবা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স (এফআইএ)-এর মাধ্যমে পাঠানো এই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে যে, সংস্থাগুলো বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন যেখানে বিমান চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ‘ক’-এ কলা, ‘খ’-এ খই! এক ঝলকে গত ১৫ বছরে তৃণমূলের ‘বর্ণমালা’
মূল সমস্যার মূলে রয়েছে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। যেহেতু বিশ্বের তেলের বড় একটা অংশ এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে, তাই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি লাফিয়ে বেড়েছে। বর্তমানে দিল্লিতে এক কিলোলিটার বিমান জ্বালানির দাম ২ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা গত মাসের তুলনায় প্রায় ১১৫ শতাংশ বেশি।
বিমান সংস্থাগুলোর মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই খরচ হয় জ্বালানিতে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে বিমানের টিকিটের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, কিন্তু তাতেও লোকসান সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই জ্বালানির এই বাড়তি বোঝা বহন করতে না পেরে এয়ারলাইন্সগুলো তাদের আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
এফআইএ-র পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রককে লেখা চিঠিতে এক অদ্ভুত বৈষম্যের কথা জানানো হয়েছে। কেন্দ্র সরকার অভ্যন্তরীণ বা ঘরোয়া উড়ানের ক্ষেত্রে জ্বালানির দামের বৃদ্ধি প্রতি লিটারে ১৫ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও, আন্তর্জাতিক উড়ানের ক্ষেত্রে তা একধাক্কায় লিটার প্রতি প্রায় ৭৩ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বিপুল দামের পার্থক্যের কারণে আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চালানো এখন লোকসানের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের বড় বড় শহর থেকে বিদেশের দীর্ঘপাল্লার উড়ানগুলো এখন কার্যত বাতিলের মুখে। বিমান সংস্থাগুলোর দাবি, সরকার যেন অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক—উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বা ‘ক্র্যাক ব্যান্ড’ (Crack Band) মেকানিজম চালু করে, যাতে তেলের দামের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
জ্বালানির চড়া দাম ছাড়াও ট্যাক্সের বোঝা বিমান সংস্থাগুলোকে আরও বেশি চাপে ফেলেছে। এটিএফ-এর ওপর বর্তমানে ১১ শতাংশ আবগারি শুল্ক (Excise Duty) দিতে হয়, যা জ্বালানির দাম বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এর ওপর রয়েছে বিভিন্ন রাজ্যের চড়া ভ্যাট (VAT)। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে ভ্যাটের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এয়ারলাইন্সগুলোর দাবি, এই সংকটকালীন সময়ে সরকার যেন অন্তত সাময়িকভাবে হলেও আবগারি শুল্ক মকুব করে এবং ভ্যাটের হার কমিয়ে একটা নির্দিষ্ট স্তরে নিয়ে আসে। তাদের মতে, এখনই যদি কোনো বড় ধরণের আর্থিক প্যাকেজ বা ঋণ সহায়তা না পাওয়া যায়, তবে লিকুইডিটি বা নগদ টাকার অভাবে অনেক সংস্থাই তাদের কর্মীদের বেতন দিতে পারবে না এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিমানগুলো মাটিতে বসিয়ে দিতে হবে।
আরও পড়ুনঃ ‘ভাজা মাছ উলটে খেতে না পারা’ মাস্টারমশাইকে কমিশনের মৃদু দাওয়াই! ‘অঙ্ক শেখান ভালো করে..হুমকি কেন?’
সাধারণ যাত্রীদের ওপরও এই সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেক সংস্থা ইতিমধ্যেই টিকিটের ওপর ৩৯৯ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ফুয়েল সারচার্জ’ বসিয়েছে। যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে বিমানের টিকিটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যা দেশের পর্যটন শিল্প এবং সার্বিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে। পরিশেষে বলা যায়, ভারতের বিমান চলাচল ক্ষেত্র এখন এক আইসিইউ-তে থাকা রোগীর মতো। সরকার যদি সময়মতো সঠিক ‘অক্সিজেন’ অর্থাৎ আর্থিক ও নীতিগত ছাড় না দেয়, তবে দেশের মানচিত্র থেকে হয়তো অনেক নামি বিমান সংস্থাই মুছে যাবে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্র সরকার এই গভীর সংকটে কতটা দ্রুত এবং কী ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।


