রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে ফের বড়সড় ধাক্কা খেল তৃণমূল কংগ্রেস। দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদে দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার গ্রেফতারিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ক্যানিংয়ের জীবনতলা থানা এলাকার দেউলি ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান হাফিজুল মোল্লা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী শাহজাহান মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই সময়ে মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম থেকে খুনের পুরনো মামলায় ধরা পড়েছেন ব্লক তৃণমূল সভাপতি মহম্মদ এনায়েত উল্লাহ। এই দুই ঘটনায় রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ রাস্তাতেই নমাজ পাঠ করবেন, পুলিশি বাঁধা মানবেন না; রাজাবাজারে অ্যাকশনে কলকাতা পুলিশ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাঙড়ের এক বাসিন্দার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই হাফিজুল মোল্লা ও শাহজাহান মোল্লার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগকারীর দাবি, তাঁকে মারধর করা হয়েছে এবং খুনের চেষ্টাও করা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ খুনের চেষ্টা, বেআইনি জমায়েত, অস্ত্র আইনে অপরাধ, গুরুতর আঘাত, ভয় দেখানো এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার মতো একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করেছে। তদন্তে নেমে পুলিশ দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
হাফিজুল মোল্লা অবশ্য এর আগেও বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছিলেন। বিধানসভা ভোটের প্রচারের সময় তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রকাশ্যে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিরোধীদের উপর “স্টিম রোলার চালানো হবে”। সেই মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে ওঠে। পরে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে গত ৪ এপ্রিল তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যদিও কিছুদিন পর তিনি জামিন পান। এবার ফের নতুন মামলায় তাঁর গ্রেফতারি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম থেকেও এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার গ্রেফতারের খবর সামনে এসেছে। ব্লক তৃণমূল সভাপতি মহম্মদ এনায়েত উল্লাহকে ২০২৩ সালের একটি খুনের মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ, এক যুবককে গুলি করে খুন করার ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। সেই সময় খুন ও অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের হলেও দীর্ঘদিন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়নি। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এতদিন পুলিশ সক্রিয় হয়নি।
রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তনের পরই প্রশাসনের ভূমিকা বদলেছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। তাঁদের দাবি, আগে যাঁরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইন এড়িয়ে যেতেন, এখন তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। বিজেপির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, রাজ্যে “আইনের শাসন” ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং অপরাধের সঙ্গে যুক্ত যে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুনঃ শিলিগুড়ি-এনজেপি ডবল লাইন প্রকল্পে বড় অনুমোদন
তবে তৃণমূলের তরফে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। দলের একাংশের বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই বিরোধী শাসনে তৃণমূল নেতাদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, পুরনো মামলাগুলিকে সামনে এনে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা বহু পুরনো অভিযোগ ও মামলায় এখন নতুন করে তদন্ত শুরু হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে আরও একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হতে পারে বলেও জল্পনা তৈরি হয়েছে। এদিকে, সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।


