রাজনীতিতে রাতারাতি ভাগ্য বদলের গল্প নতুন নয়, কিন্তু রাজারহাটের দেবরাজ চক্রবর্তীর উত্থান ও পতনের কাহিনী যেকোনো টানটান থ্রিলার সিনেমাকেও টেক্কা দিতে পারে। তেঘরিয়ার এক সাধারণ রোগাপাতলা বেকার যুবক থেকে আজ কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এবং মিরিকে পাহাড় কেনার মতো অবিশ্বাস্য প্রতিপত্তি— সবটাই সম্ভব হয়েছে চরম সুযোগসন্ধানী মানসিকতা ও ক্ষমতার অলিন্দে অবাধ যাতায়াতের জোরে।
আরও পড়ুনঃ ছক্কার পর ছক্কা, মানুষের আস্থা ফেরাচ্ছে বাংলার পুলিশ; গ্রেফতার দেবরাজের ছায়াসঙ্গী ননী
চাটুকারিতা থেকে ক্ষমতার অলিন্দে
শুরুর দিনগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আসার জন্য দেবরাজ বেছে নিয়েছিলেন চাটুকারিতার রাস্তা। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজারহাট-গোপালপুরের তৎকালীন বিধায়ক তথা মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু এবং নেত্রী দোলা সেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। ‘পিসি’ ও ‘জ্যেঠু’র আস্থাভাজন সেজে দেবরাজ সহজেই নিজের প্রভাব বাড়াতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও উঁচুতে।
দলবদল ও ‘যুবরাজ’ হয়ে ওঠা
২০১৬ সালের বিধাননগর পুরভোটে তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে দেবরাজ রাতারাতি কংগ্রেসের টিকিটে ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে জয়ী হন। কিন্তু ভোটের দিন অশান্তির জেরে জেল খাটতে হয় তাঁকে। জেল থেকে বেরিয়েই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে রং বদলে আবার ঘাসফুল শিবিরে ফিরে আসেন তিনি।
পরবর্তীকালে পুরনো আশ্রয়দাতাদের হাত ছেড়ে তিনি তৎকালীন যুব নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য এমন জায়গায় নিয়ে যান যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পুরনো মেন্টরদের টিকিট কেটে নিজের স্ত্রী, খ্যাতনামা কীর্তন শিল্পী অদিতি মুন্সিকে রাজারহাট-গোপালপুর আসন থেকে তৃণমূলের টিকিট এনে দেন এবং জয়ী করান। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি; রাজারহাটের অলিখিত ‘যুবরাজ’ হয়ে ওঠেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ গ্রেপ্তার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডান হাত’ বাগুইআটির ‘তোলাবাজ’ ‘ত্রাস’ দেবরাজ
বিলাসিতা, দাপট ও পতন
করোনা মহামারীর চরম সংকটের সময়েও যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা, তখন দেবরাজের রাজকীয় জন্মদিন পালনের আড়ম্বর ও বিলাসিতা সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। বিধাননগর পুরনিগমের মেয়র পারিষদ থেকে শুরু করে যুব সংগঠনের শীর্ষ পদের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। অভিযোগ, রাজারহাট, নিউটাউন এবং দমদম এলাকায় কে পঞ্চায়েত বা পুরসভার টিকিট পাবেন, তা একপ্রকার দেবরাজই ঠিক করতেন। এমনকি বিরোধী তো বটেই, দলের অন্দরেও ব্রাত্য বসুর ঘনিষ্ঠদের কোণঠাসা করে নিজের পছন্দের লোকেদের চেয়ারে বসানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এলাকায় প্রোমোটিং, সিন্ডিকেট রাজ এবং তোলাবাজির চক্র নিয়ন্ত্রণ করার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে বারবার তাঁর নাম জড়িয়েছে। অবশেষে কয়লা পাচার মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থার (ED) স্ক্যানারে আসা এবং সাম্প্রতিক তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতারি— রকেটের গতিতে ওপরে ওঠা দেবরাজের সাম্রাজ্যে এখন শুধুই পতনের অন্ধকার।



