রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়েছে বাম শিবির, বিশেষ করে সিপিএম। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল বিরোধিতার রাজনীতি করতে করতে তারা যেন একপ্রকার অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাংলার ক্ষমতায় বিজেপির উত্থান সেই পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ফলে এখন বিজেপির বিরুদ্ধে ঠিক কোন পথে আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত, তা নিয়েই যেন দ্বিধা ও বিভ্রান্তিতে ভুগছে সিপিএমের সহ বামেদের একাংশ।
আরও পড়ুনঃ দেশজুড়ে আবারও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
রাজনৈতিক মহলের মতে, এবারের নির্বাচনে সিপিএমের মূল লক্ষ্য কখনওই সরকার গঠন ছিল না। বরং তারা চাইছিল অন্তত কিছু আসনে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে। অর্থাৎ, বিজেপিকে আটকাতে গিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলেও আপত্তি ছিল না অনেকের। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল, সমস্ত হিসেব উল্টে দিয়ে বিজেপিই ক্ষমতায় এসেছে। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে সিপিএমের রাজনৈতিক সংকট।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে এতদিন সিপিএম মূলত দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, কাটমানি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারির মতো ইস্যুকে সামনে রেখে আন্দোলন করেছে। সেই লড়াইয়ে তথ্য ও যুক্তির জায়গা ছিল। ফলে শতরূপ ঘোষ বা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো নেতাদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের একাংশ মন দিয়ে শুনত। বিশেষ করে আদালত এবং টেলিভিশনের পর্দায় বিকাশরঞ্জনের তথ্যভিত্তিক আক্রমণ বহু মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
কিন্তু বিজেপির ক্ষেত্রে সেই একই কৌশল কার্যকর হচ্ছে না বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। কারণ এখানে শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিরোধিতা নয়, মতাদর্শগত সংঘর্ষও জুড়ে গিয়েছে। ফলে বিজেপির বিরুদ্ধে সিপিএমের প্রচারে এখন বেশি করে উঠে আসছে “ফ্যাসিস্ট শক্তি”, “হিন্দুত্ববাদ”, “বহিরাগত”, “গুটখাখোর” ইত্যাদি শব্দ। কিন্তু সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, এই ভাষা রাজনৈতিক যুক্তির চেয়ে বিদ্বেষকেই বেশি প্রকাশ করছে। তাছারা সিপিএম সহ বামেদের যোগ্য নেতৃত্বের অভাব আছে। তাছারাও রয়েছে বাস্তব চিন্তাধারার অভাব।
সমালোচকদের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে সিপিএম সহ বামেদের বেশ কিছু নেতার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। যে শতরূপ ঘোষ একসময় যুক্তি দিয়ে তৃণমূলকে চাপে ফেলতেন, তাঁর সামাজিক মাধ্যমে কুরুচিকর মন্তব্য অনেককেই হতাশ করছে। একইভাবে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলের নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে তাঁর অবস্থান বদল সাধারণ মানুষের একাংশকে বিস্মিত করেছে।
আরও পড়ুনঃ দেশজুড়ে আবারও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিপিএম সহ বাম শরিকরা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি বিজেপির বিরুদ্ধে ঠিক কোন ধরনের বিরোধিতায় মানুষ সাড়া দেবে। শুধুমাত্র মতাদর্শের ভাষা নয়, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, কর্মসংস্থান, শিল্প, শিক্ষা ও প্রশাসনিক প্রশ্নে বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে বাম শিবির।
এখন দেখার, সিপিএম সহ বাম শরিকরা নিজেদের পুরনো রাজনৈতিক রণকৌশল বদলে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে কি না। কারণ রাজনীতিতে সময়ের সঙ্গে কৌশল না বদলালে, তা অনেক সময় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবেই প্রমাণিত হয়।




