পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপি আর সিপিএমের সংঘাত নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ফলতা উপনির্বাচনের পর এই সংঘাতকে ঘিরে নতুন এক আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনা শুধুমাত্র বিজেপি বনাম তৃণমূল নয়, বরং বিজেপি আদৌ তৃণমূল কংগ্রেসকে পুরোপুরি শেষ হতে দেখতে চায় কি না, সেটাকেও কেন্দ্র করে। কারণ, তৃণমূল দুর্বল হলে যে রাজনৈতিক শূন্যস্থান তৈরি হবে, সেখানে আবার বামেরা ফিরে আসতে পারে বলেই মনে করছেন বহু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।
আরও পড়ুনঃ সস্তা আঘাতের নাটক ও গ্যাসের ওষুধের ফানুস! মমতা ডাহা মিথ্যে
২০২৬ সালের ফলতা উপনির্বাচনের ফল সামনে আসার পর এই আলোচনা হঠাৎ করেই জাতীয় স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই কেন্দ্রে বিজেপি এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয় পায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে দ্বিতীয় স্থানের লড়াই। সেখানে সিপিএম সমর্থিত প্রার্থী দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে এবং তৃণমূল চতুর্থ স্থানে নেমে যায়। কয়েক বছর আগেও যে রাজ্যে তৃণমূল আর বিজেপিকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হত, সেখানে হঠাৎ সিপিএমের এই প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত রাজনৈতিক মহলে নতুন হিসাব কষতে বাধ্য করে।
এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য অনেকটাই পিছিয়ে যেতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। সেই সময় সিপিএম শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল ছিল না, তারা ছিল গোটা রাজ্যের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক শক্তি। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে কলেজ ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন থেকে শিক্ষক সংগঠন, প্রায় সর্বত্র বামপন্থী প্রভাব ছিল প্রবল। সেই সময় বিজেপি বাংলায় প্রায় অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিল। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে গোটা দেশে বিজেপির মাত্র ২টি আসন ছিল। পশ্চিমবঙ্গে তাদের ভোট শতাংশ দীর্ঘদিন ৫ শতাংশের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করেছে।
অন্যদিকে আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বাংলায় নিজেদের সংগঠন বাড়ানোর চেষ্টা চালালেও বাম আমলে তারা কখনও বড় রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করতে পারেনি। কারণ, সিপিএম এবং আরএসএসের সংঘাত শুধুমাত্র ভোটের সংঘাত ছিল না, সেটা ছিল আদর্শগত সংঘাত। একদিকে মার্কসবাদী রাজনীতি, অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ। এই দ্বন্দ্ব ষাটের দশক থেকেই তৈরি হতে শুরু করে। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর দেশের একাংশে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি হয়। সেই সময় জনসঙ্ঘ এবং ডানপন্থী সংগঠনগুলি কমিউনিস্টদের ‘বিদেশমুখী’ আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। পরে ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠনের পর সেই সংঘাত আরও তীব্র হয়।
নব্বইয়ের দশকে অযোধ্যা আন্দোলন এবং বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও বামেদের রাজনৈতিক সংঘর্ষ জাতীয় স্তরে আরও বড় আকার নেয়। বাম দলগুলি বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। বিজেপি আবার বামপন্থীদের ‘ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং ‘জাতীয়তাবিরোধী মানসিকতা’র অভিযোগে আক্রমণ করতে থাকে। কেরলের কান্নুর জেলা থেকে শুরু করে ত্রিপুরা পর্যন্ত বহু জায়গায় আরএসএস এবং সিপিএম কর্মীদের সংঘর্ষ বহুবার রক্তক্ষয়ী আকার নেয়। কেরলে কয়েক দশকে দুই পক্ষের মিলিয়ে বহু রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে আরএসএসের কাছে বামপন্থীরা শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, দীর্ঘদিনের আদর্শগত শত্রু হিসেবেও পরিচিত।
পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম এবং সিঙ্গুর আন্দোলনের পর। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বামবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু এখানেই নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরু হয়। কারণ, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বামেদের যে সাংগঠনিক কাঠামো ছিল, সেটি দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। বহু জায়গায় স্থানীয় বাম কর্মীরা তৃণমূলে যোগ দেন। আবার কোথাও কোথাও বাম ভোটারদের একাংশ ধীরে ধীরে বিজেপির দিকে যেতে শুরু করেন।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপির উত্থান বাংলায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ২টি লোকসভা আসন জেতে। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮। একই সময়ে সিপিএম এবং বামফ্রন্ট কার্যত ভেঙে পড়ে। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের ভোট শতাংশ ছিল প্রায় ৪১ শতাংশ। ২০২১ সালের নির্বাচনে তা নেমে যায় প্রায় ৫ শতাংশে। এই বিশাল পতনের বড় অংশের রাজনৈতিক লাভ পায় বিজেপি। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, বিজেপির উত্থানের পেছনে প্রাক্তন বাম ভোটারদের বড় ভূমিকা ছিল।
এই জায়গাতেই বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত। কারণ, বিজেপি বাংলায় যত শক্তিশালী হয়েছে, তার অনেকটাই এসেছে বাম রাজনীতির পতনের পর তৈরি হওয়া শূন্যস্থান থেকে। ফলে এখন যদি তৃণমূল দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে এবং বিরোধী ভোট আবার ভাগ হতে থাকে, তাহলে সেই ভোটের একটা অংশ ফের সিপিএমের দিকে যেতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন অনেক বিশ্লেষক। ফলতা উপনির্বাচনের ফল সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি মতামতমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আরএসএসের একাংশ এখনও বামপন্থীদের দীর্ঘমেয়াদি আদর্শগত শত্রু হিসেবেই দেখে। তাদের মতে, তৃণমূল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেও কমিউনিস্ট রাজনীতির পুনরুত্থান বিজেপির জন্য ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, বামপন্থীরা একসময় বাংলার গ্রাম, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে গভীর প্রভাব তৈরি করেছিল। সেই পুরনো ভিত্তির একটি অংশ এখনও পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি বলেই মনে করা হচ্ছে।
ফলতা উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেটি হল, বিজেপির সবচেয়ে বড় সুবিধা এতদিন ছিল বিরোধী ভোটের একমুখী মেরুকরণ। অর্থাৎ, যারা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে চাইতেন, তাদের বড় অংশ বিজেপির দিকে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ফলতায় দেখা গেল, তৃণমূলের বিরুদ্ধে থাকা ভোটের একটি অংশ আবার সিপিএম সমর্থিত প্রার্থীর দিকেও ফিরেছে। এই পরিবর্তন সংখ্যার দিক থেকে এখনও খুব বড় না হলেও রাজনৈতিক দিক থেকে তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ফলতা কেন্দ্রে বিজেপি এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জয় পায়। কিন্তু সিপিএম সমর্থিত প্রার্থীর দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা এবং তৃণমূলের চতুর্থ স্থানে নেমে যাওয়া গোটা সমীকরণটাই বদলে দেয়। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান রাজনৈতিক লড়াই ছিল তৃণমূল বনাম বিজেপি। সেখানে হঠাৎ বামেদের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা বোঝাচ্ছে যে কিছু ভোটার আবার পুরনো রাজনৈতিক ঘাঁটির দিকে তাকাতে শুরু করেছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বড় কারণের কথা বলা হচ্ছে। প্রথমত, তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় স্তরে অসন্তোষ নিয়ে বহুদিন ধরেই অভিযোগ উঠছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, বিজেপির মধ্যেও একাংশ ভোটারের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছেন কিছু বিশ্লেষক। বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে না পারার পর বিজেপির সংগঠনগত গতি কিছু জায়গায় কমেছে বলেও মত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সিপিএম নিজেদের আবার বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং শহুরে মধ্যবিত্তের একাংশকে ঘিরে তারা নতুন করে সংগঠন গড়ার চেষ্টা শুরু করেছে। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাম ছাত্র সংগঠনের কার্যকলাপ আবার দৃশ্যমান হয়েছে। যদিও তা এখনও নব্বইয়ের দশক বা দুই হাজারের শুরুর সময়ের মতো শক্তিশালী নয়, তবুও রাজনৈতিক আলোচনায় এই পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আরএসএস এবং বিজেপির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও জটিল। কারণ, তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়াই একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। কেরলের কান্নুরে আরএসএস ও সিপিএম কর্মীদের সংঘর্ষ কয়েক দশক ধরে জাতীয় রাজনীতির আলোচনার বিষয়। ত্রিপুরাতেও বাম আমলে আরএসএসের বিস্তার সীমিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গেও বাম শাসনের সময় আরএসএস সংগঠন বড় আকার নিতে পারেনি। ফলে সঙ্ঘ পরিবারের একাংশ এখনও কমিউনিস্ট রাজনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শগত চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখে।
এই কারণেই এখন একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব সামনে আসছে। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিজেপি অবশ্যই তৃণমূলকে দুর্বল করতে চায়, কিন্তু তৃণমূল পুরোপুরি ভেঙে গেলে যে রাজনৈতিক শূন্যস্থান তৈরি হবে, তা যদি বামেরা দখল করতে শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, বামেদের পুরনো সাংগঠনিক ভিত্তি একসময় গোটা বাংলাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। শুধু ভোট নয়, পাড়া কমিটি, শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষক সংগঠন, কৃষক সংগঠন, সাংস্কৃতিক মঞ্চ, বইমেলা, নাট্যচর্চা, কলেজ রাজনীতি সহ বহু ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘ প্রভাব ছিল।
তবে এই তত্ত্বের বিরোধিতাও রয়েছে। বিজেপির বহু নেতা প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে তারা বাংলায় তৃণমূলকে পুরোপুরি সরিয়ে প্রধান শক্তি হতে চান। সাম্প্রতিক সময়ে বহু তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। আবার বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা তৃণমূলের অসন্তুষ্ট নেতাদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করছে। ফলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপি আদতে তৃণমূলকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে, এমন কোনও সরাসরি প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বাস্তব রাজনীতিতে কখনও কখনও আদর্শগত শত্রু এবং নির্বাচনী প্রতিপক্ষ এক জিনিস হয় না। বিজেপির কাছে তৃণমূল এখন সবচেয়ে বড় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, আরএসএসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়াই অনেক পুরনো। সেই কারণেই ফলতা উপনির্বাচনের মতো একটি ফলাফল হঠাৎ এত বড় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
২০১১ সালে বাংলায় বামফ্রন্টের পতনের পর থেকে রাজ্যের রাজনীতি মূলত দুই মেরুতে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একদিকে তৃণমূল, অন্যদিকে বিজেপি। কিন্তু ফলতার ফলাফল দেখার পর এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই দুই মেরুর মাঝখানে আবার কি তৃতীয় রাজনৈতিক জায়গা তৈরি হচ্ছে? কারণ, সিপিএমের ভোট একসময় ৪০ শতাংশের উপরে ছিল। বর্তমানে তা অনেক কমে গেলেও সেই পুরনো ভোটভিত্তির একটি অংশ এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বলেই মনে করছেন অনেকে। সেই কারণেই ফলতার মতো একটি উপনির্বাচন এখন শুধুমাত্র স্থানীয় ফলাফল নয়, বরং ভবিষ্যতের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।



