Sunday, 5 July, 2026
5 July
HomeকলকাতাTMC: বিপদে হাত ছাড়তে 'ওস্তাদ' তৃণমূল! সুপরিকল্পিত 'বিশ্বাসঘাতকতা'

TMC: বিপদে হাত ছাড়তে ‘ওস্তাদ’ তৃণমূল! সুপরিকল্পিত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’

যে সৈনিকেরা দিন-রাত এক করে দলকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে দেন, বিপদের দিনে তাঁদেরই সবার আগে একা ছেড়ে দেয় তৃণমূল। বিচারের বাণী যখন নীরবে কাঁদে, দল তখন নিজের পিঠ বাঁচাতে ঘরের ছেলেদেরই আইনি ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলে।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে “বিশ্বাসঘাতকতা” বা “বলির পাঁঠা” বানানোর তত্ত্বটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী ধাক্কা, অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং একের পর এক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান এই চর্চাকে আবার উসকে দিয়েছে।

সুমিত রায়, দেবরাজ চক্রবর্তী এবং অতীতে কুনাল ঘোষের মতো নেতাদের পরিণতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলের স্বার্থে বা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে তৃণমূল কীভাবে তার নিজস্ব সেনাপতিদেরই একা ফেলে দেয়! সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা ও আবেগের মেলবন্ধনে সেই চিত্রটি নিচে তুলে ধরা হলো।

যাঁরা একসময় দলের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তাঁদেরই মাথার ওপর থেকে দলের ছাতা সরে গেছে। আইনি লড়াইয়ে তাঁরা এখন বড্ড একা।

সুমিত রায় সাধারণ কোনো নাম নন; তিনি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী। দলের একাংশের অন্তর্কলহের জেরেই হোক বা আইনি চাপ, আজ সেই সুমিতেরই আশ্রয় খুঁজতে হচ্ছে আদালতের দরজায়।

আরও পড়ুনঃ বিবাদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র; তৃণমূল ভবনের তালা খুলে ফেলল মালিকপক্ষ

পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী থানায় জমি দখল ও দুর্নীতির মামলায় সুমিতের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে জেলা আদালত। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে পুলিশ যখন কলকাতার কালীঘাটে (অভিষেকের বাসভবনে) হানা দেয়, তখন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর সেই তৎপরতা ছিল দেখার মতো। সুমিত রায় বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন জানিয়েছেন।

“বিশ্বাসঘাতকতা” নাকি ক্ষমতার অঙ্ক? রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে দলেরই বিক্ষুব্ধ অংশ বলছে, সুমিতকে আসলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাঁচানোর জন্য ‘বফার’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে? দল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত তৃণমূল মুখপত্র ঋজু দত্ত পর্যন্ত জনসমক্ষে বলেছেন, সুমিত গ্রেপ্তার হলে “অনেক বড় বড় মাথার রক্ত ঝরবে”। অর্থাৎ, বিপদে দলের এই বিশ্বস্ত সৈনিকের পাশ থেকে হাত তুলে নেওয়া হয়েছে।

বিধাননগরের দাপুটে নেতা, গায়িকা-রাজনীতিক অদিতি মুন্সীর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তী একসময় উত্তর ২৪ পরগনায় দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন। কিন্তু আজ ক্ষমতার সেই ঔজ্জ্বল্য ম্লান।

এক ৮৬ বছরের বৃদ্ধকে তোলাবাজি ও হুমকি দেওয়া, বেআইনি জমি সিন্ডিকেট চালানো এবং নির্বাচনী হলফনামায় সম্পত্তি গোপনের ‘অভিযোগে’ পুরুলিয়া থেকে দেবরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাগুইআটি থানার পুলিশ তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমিত চক্রবর্তী ওরফে ‘ননি’কেও গ্রেপ্তার করেছে। হাইকোর্টের নির্দেশে দেবরাজ এখন সম্পূর্ণ কোণঠাসা।

বিধাননগর-সল্টলেক এলাকায় যে সিন্ডিকেট রাজ নিয়ে দল বারবার মুখ পুড়িয়েছে, তা থেকে নিজেদের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ করতেই কি দেবরাজকে বলি দেওয়া হলো? দলের নিচু তলার কর্মীদের ক্ষোভ— যখন সুসময় ছিল, তখন দেবরাজদের ব্যবহার করা হয়েছে; আর যখন আইনি খাঁড়া নেমে এলো, তখন দল তাঁকে ঝেড়ে ফেলল।

আরও পড়ুনঃ টার্গেট ভারত কেশরী, সুকিয়া স্ট্রিটে উন্মোচনের আগেই শ্যামপ্রসাদের মূর্তিতে ব্যাপক ভাঙচুর

তৃণমূলের অন্দরে “ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলার” সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক উদাহরণ হলেন কুনাল ঘোষ। ২০১৩ সালে সারদা কাণ্ডের সময় কুনালের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা আজ সুমিত বা দেবরাজদের জন্য এক জ্বলন্ত সতর্কবার্তা।

সাংবাদিক কুনাল ঘোষকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ভালোবেসে ২০১২ সালে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন। সারদা মিডিয়া গ্রুপের সিইও হিসেবে তিনি তখন ক্ষমতার মধ্যগগনে। কিন্তু ২০১৩ সালে যখন সারদা চিটফান্ডের লাখ লাখ গরিব মানুষের টাকা লুঠের কেলেঙ্কারি সামনে এলো, তখন জনরোষের মুখে পড়ে দল। নিজেদের পিঠ বাঁচাতে দলনেত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কুনালকেই প্রথম নিশানা করা হয়। কুনাল যখন বুঝলেন তাঁকে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে, তিনি মুখ খুলতে শুরু করেন। ফলস্বরূপ, দল তাঁকে “দলবিরোধী” তকমা দিয়ে সাসপেন্ড করে।

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে বিধাননগর পুলিশ (যা তখন তৃণমূল সরকারেরই অধীনে) কুনাল ঘোষকে গ্রেপ্তার করে।

যে দলের হয়ে তিনি দিনরাত সওয়াল করতেন, সেই দলের পুলিশই তাঁকে খাঁচায় পুরল। ক্ষোভে, অপমানে জেলে থাকাকালীন কুনাল চিৎকার করে বলেছিলেন, সারদা মিডিয়ার “সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী” খোদ শীর্ষ নেতৃত্ব।

প্রায় তিন বছর বন্দিজীবন কাটান তিনি। ২০১৪ সালে জেলের ভেতরেই অপমানে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। ২০১৬ সালে জামিন পাওয়ার পর, নিজেকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে সারদা থেকে পাওয়া বেতন ও বিজ্ঞাপনের প্রায় ২.৬৭ কোটি টাকা আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত দেন তিনি।

রাজনীতির চোরাবালি বড় অদ্ভুত।

সেই কুনাল ঘোষই আবার দলে ফিরেছেন, বেলেঘাটার বিধায়ক হয়েছেন, দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে আবার বিরোধীদের দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু তাঁর অতীতের সেই বন্দিদশা ও কান্না আজও বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে দলীয় “বিশ্বাসঘাতকতার” এক জ্বলন্ত দলিল।

রাজনীতিতে আসলে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে কিছু হয় না, যা থাকে তা হলো “আত্মরক্ষা এবং ক্ষমতার স্বার্থ”। যখনই কোনো দুর্নীতির আঁচ বা কেলেঙ্কারি দলের শীর্ষ ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তিতে আঘাত করে, তখনই তৃণমূল কংগ্রেস তার সেই অংশের ডাল কেটে ফেলে দেয়—তা সে অভিষেক-ঘনিষ্ঠ সুমিত রায় হোন, বিধাননগরের দেবরাজ চক্রবর্তী হোন, কিংবা অতীতের কুনাল ঘোষ।

নেতারা ভাবেন তাঁরা দলের অপরিহার্য অংশ কিন্তু রাজনীতির নির্মম সত্য হলো, প্রয়োজন ফুরোলে বা পিঠ বাঁচানোর তাগিদ এলে দল তাঁদের আইনি ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলতে দুবার ভাবে না।

অভিযোগের পাহাড় জমলেও, আইনত সুমিত রায় কিংবা দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত একটিও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। ঠিক যেভাবে সারদা কাণ্ডে দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও কুনাল ঘোষের বিরুদ্ধে কোনো দোষ প্রমাণ করা যায়নি। কিন্তু ক্ষমতার লড়াইয়ে আইনি প্রমাণ বড় নয়, বড় হলো রাজনৈতিক স্বার্থ।

যে সৈনিকেরা দিন-রাত এক করে দলকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে দেন, বিপদের দিনে তাঁদেরই সবার আগে একা ছেড়ে দেয় তৃণমূল। বিচারের বাণী যখন নীরবে কাঁদে, দল তখন নিজের পিঠ বাঁচাতে ঘরের ছেলেদেরই আইনি ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলে। কুনালের সেই বন্দিদশা ও কান্না থেকে শুরু করে আজ সুমিত-দেবরাজদের অসহায়তা: সবটাই প্রমাণ করে, প্রয়োজন ফুরোলে বা দলের গায়ে আঁচ লাগলে তৃণমূল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতিদের হাত ছাড়তেও দ্বিধা করে না। এই নির্মম উদাসীনতাই আসলে রাজনীতির আঙিনায় এক চরম, সুপরিকল্পিত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন