দূর্গাপুজোর আসন্ন উৎসবের রঙ এখনও ক্যালেন্ডারে তিন মাস বাকি থাকলেও, দুর্গাপুরের একটি কোণে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে দেবী দুর্গার আরাধনার প্রাণবন্ত আয়োজন। ঢাক, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনির সুর আর ফুলে-ফুলে সাজানো প্রতিমার সামনে ভক্তদের ভিড় দেখে মনে হবে মহালয়া এসে গিয়েছে। কিন্তু এ সব উৎসব শুরু হয়েছে রথযাত্রার দিন থেকেই।

দুর্গাপুরের এমএএমসি বি-২ এলাকার শ্রীশ্রী সর্বমঙ্গলা দুর্গা মন্দিরে গত ৫৬ বছর ধরে চলে আসছে একটি অনন্য প্রথা। এখানে রথযাত্রার দিন থেকেই মন্দিরে দেবী দুর্গার প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং শুরু হয় তাঁর নিত্যপুজো। দেবীপক্ষের অপেক্ষা না করে, রথের দিন থেকেই মা-কে আহ্বান জানান এলাকার বাসিন্দারা, কারণ তাদের বিশ্বাস, ‘রথের দড়ি পড়লেই মায়ের আগমন।’
আরও পড়ুনঃ পশ্চিমবঙ্গ ঝাড়খণ্ড সীমান্তে নিম্নচাপ, তবুও দেখা নেই ঘনঘোর বর্ষার!
পুরাণে বর্ণিত আছে, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে শ্রীরামচন্দ্র শরতের আগেই দেবী দুর্গার আরাধনা করতেন। সেই অকাল আরাধনাই পরবর্তীকালে ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত হয়েছে। যদিও দুর্গাপুরের এই পুজো প্রচলিত অকালবোধনের আচার নয়, তবু এটি বাংলার পুজো-সংস্কৃতিতে একটি অভিনব মাত্রা যোগ করেছে।
উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় আরও অনেক আগেই। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ‘পাটা পুজো’ দিয়ে প্রতিমা নির্মাণের সূচনা হয়। পরে দুর্গাপুর স্টেশন বাজারে শিল্পীর হাতে তৈরি হয় মাটির প্রতিমা। রথযাত্রার দিন দেবীকে শাড়ি, ফুলের মালা ও ফুলের গয়নায় সাজিয়ে শোভাযাত্রায় মন্দিরে আনা হয়। সেখানে এলাকার মহিলারা বরণ করে নেন দেবীকে। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ঢাকের তালে গোটা এলাকা মুখরিত হয়, আর পুরুষেরা নাচ-গানে যোগ দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।

এরপর থেকে শুরু হয় মায়ের নিত্যপুজো। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়ম করে আরতি, পুজো ও ভোগ নিবেদন করা হয়। শুধু দুর্গোৎসবের সময় নয়, বছরের দীর্ঘ সময়জুড়ে মন্দিরটি এলাকার মানুষের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হয়ে থাকে। দুর্গাপুজোর সময় এখানে পালন করা হয় একাধিক প্রাচীন রীতি। পুরাণ সম্মত বিধি মেনে পুজো হয়। অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে ‘সন্দেশ বলি’ দেওয়ার প্রথাও চালু আছে, যা এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আরও পড়ুনঃ সাত সকালে বহরমপুরে মর্মান্তিক ঘটনা; পুলকারে ট্রেনের ধাক্কা
এলাকার বাসিন্দা সত্যব্রত দাস জানান, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, রথের দড়ি পড়লেই মা আসেন। গত ৫৬ বছর ধরে এই প্রথা একদিনও বন্ধ হয়নি। এলাকার মানুষ বিশ্বাস করেন, আন্তরিক ভক্তিভরে ডাকলে মা সকলের মনোবাসনা পূরণ করেন।”

সাধারণত মহালয়া মানেই দুর্গাপুজোর শুরু, কিন্তু দুর্গাপুরের এই পাড়ায় সেই অপেক্ষা অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। রথযাত্রার দিন থেকেই কার্যত শুরু হয়ে যায় দুর্গোৎসবের আবহ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ঐতিহ্য আজও একই নিষ্ঠায় বাঁচিয়ে রেখেছেন এলাকার বাসিন্দারা। তাই ক্যালেন্ডারে পুজোর দিন এখনও বাকি থাকলেও, দুর্গাপুরের এই মন্দিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে মায়ের আগমনের উৎসব।


