পঞ্জিকা মেনে নয়, বরং তিথির পরের দিন পালিত হয় জামালপুর ১ নম্বর পঞ্চায়েতের ঐতিহাসিক সেলিমাবাদ গ্রামের রথযাত্রা, যা গত শতাধিক বছর ধরে চলে আসছে এক ব্যতিক্রমী রীতিতে। এখানে রথযাত্রার দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা নিজেই রথে থাকেন না; তাদের পরিবর্তে ভক্ত রাধাকৃষ্ণ ও গোপাল টানা রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান।
আরও পড়ুনঃ ক্ষমতা বদলের ছাপ প্রশাসনের অন্দরেও! বদলে গেল উত্তরকন্যার রং
এই উৎসব জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে, যার খ্যাতি বর্ধমান সীমা ছাড়িয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সেলিমাবাদে কোনও হিন্দু উৎসবই পঞ্জিকা অনুযায়ী পালন করা হয় না; বরং ‘গোঁসাই মতে’ তিথির পরের দিন উৎসব হয়। রথযাত্রার পরদিন ‘বাল গোপাল জীউ’ মন্দিরে রথযাত্রার পুজো হয়, যেখানে প্রস্তর রাধাকৃষ্ণ ও অষ্টধাতুর গোপাল মূর্তির বিশেষ আরাধনা করা হয়। এরপর বিকেলে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু কাঠের রথে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় দামোদরের তীরে মাসির বাড়িতে।

গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক শক্তিপদ সাঁতরা জানান, ১৯১৮ সালের পর বৈষ্ণব সাধক দ্বীজবরদাস বৈরাগ্য সস্ত্রীক সেলিমাবাদে বসবাস শুরু করে এই মন্দির গড়ে তোলেন এবং তিথির পরের দিন রথযাত্রার সূচনা করেন। এরপর থেকে ‘বাল গোপাল জীউ’ সেবা সমিতি এই প্রথা অক্ষুণ্ন রেখে চলেছে। দোল, শিবরাত্রি, জন্মাষ্টমী ও রাস উৎসবও এখানে একদিন পরে পালিত হয়।
গ্রামের বাসিন্দা সেখ ওসমান জানান, “ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত দেখছি, এই উৎসবে হিন্দু-মুসলিম সবাই সমানভাবে অংশ নেন। আমি নিজেও রথের রশিতে টান দিই।”
আরও পড়ুনঃ ‘রিপাবলিক অব বালোচিস্তান’, স্বাধীনতা ঘোষণা করল বালোচিস্তান
ঐতিহাসিক ও পুরাতত্ত্ব গবেষক পূরবী ঘোষের মতে, সেলিমাবাদ গ্রামের ইতিহাস প্রাচীন। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে গ্রামের উল্লেখ রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, সম্রাট সেলিম খান (পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর) এই এলাকায় আস্তানা গড়ে এই এলাকার নাম সেলিমাবাদ রাখা হয়। শের আফগান হত্যার পর তাঁর পত্নী মেহেরুন্নিসাকে (নূরজাহান) এই সেলিমাবাদের দুর্গেই লুকানো হয়েছিল।
একসময় যেখানে হিন্দু ও জৈন ধর্মের প্রভাব গভীর ছিল, আজ সেলিমাবাদের রথযাত্রা উৎসব ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবমিলনের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে।


