রক্ষা ও প্রতিরক্ষা ডেস্ক:
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের দাপট কতটা মারাত্মক হতে পারে। যেকোনো দেশের জন্য শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defence) এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান শর্ত। এই প্রেক্ষাপটে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছেন ভারত সরকারের ঐতিহাসিক প্রকল্প—‘মিশন সুদর্শন চক্র’।
লক্ষ্য একটিই—শত্রুপক্ষের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল থেকে শুরু করে স্টেলথ যুদ্ধবিমানকে ভারতের আকাশসীমায় ঢোকার আগেই একাধিক স্তরে ছাই করে দেওয়া।
আরও পড়ুনঃ ‘ধমকের সংস্কৃতি অতীত, সুরক্ষিত বাংলায় বারবার আসুন’, ‘বিশ সাল বাদ’; লেখিকাকে স্বাগত মুখ্যমন্ত্রীর
তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ‘সুদর্শন চক্র’
ভারতের এই সমন্বিত এবং অত্যন্ত নিখুঁত আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় মূলত তিনটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে:
-
অত্যাধুনিক সেন্সর নেটওয়ার্ক: বহু-দূরত্বের রাডার ও ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সরের মাধ্যমে শত্রুর যেকোনো উড়ন্ত বস্তুকে মুহূর্তে শনাক্ত করা।
-
C4I ও IACCS ব্যবস্থা: কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশন, কম্পিউটারস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স (C4I) প্রযুক্তি সেন্সরের প্রাপ্ত ডেটা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করে ‘ইন্টিগ্রেটেড এয়ার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম’ (IACCS)-এর কাছে পাঠাবে, যাতে কোনো বিলম্ব ছাড়াই পাল্টা হানার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
-
বহুস্তরীয় অস্ত্র সম্ভার: সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (SAM), স্বয়ংক্রিয় গান, লেজার প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের যুগপৎ ব্যবহার।
ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার
| মিসাইল / প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | পাল্লা / সক্ষমতা | বিশেষত্ব ও গুরুত্ব |
| BMD (ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স) | বায়ুমণ্ডলের ভেতরে ও বাইরে (৫,০০০ কিমি পর্যন্ত) | বায়ুমণ্ডলের চরম উচ্চতায় শত্রুর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম। |
| প্রজেক্ট কুশা (Kusha SAM) | ১৫০ কিমি, ২৫০ কিমি ও ৩৫০ কিমি | ভারতের নিজস্ব ‘S-400’; স্টেলথ বিমান ও ক্রুজ মিসাইল ধ্বংসের জন্য প্রস্তুত। |
| MR-SAM | ৭০ কিলোমিটার | ভারত-ইজরায়েল যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা প্রাচীর। |
| আকাশ (Akash-NG) | ৮০ কিলোমিটার | দেশীয় ‘আকাশ’ মিসাইলের সর্বাধুনিক সংস্করণ, যা দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তু ভেদে পারদর্শী। |
| VSHORADS | খুব স্বল্প দূরত্ব | রুশ ‘Igla’ ক্ষেপণাস্ত্রের বিকল্প হিসেবে DRDO-র হাতে তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য ব্যবস্থা। |
আরও পড়ুনঃ প্রত্যাবর্তনের মাস; দীর্ঘ ১৯ বছরের নির্বাসন শেষে কলকাতায় তসলিমা
ড্রোন মোকাবিলায় অ্যান্টি-ড্রোন ও লেজার প্রযুক্তি
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁকে ঝাঁকে আসা ড্রোনের (Swarm Drones) বিপদ মোকাবিলায় ভারত প্রযুক্তিগতভাবে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকছে:
-
ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন (DEW): DRDO ইতিমধ্যেই ৩০ কিলোওয়াট ক্ষমতার লেজার অস্ত্র সফল পরীক্ষা করেছে, যা লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে আকাশে থাকা ড্রোন মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস বা পুড়িয়ে দিতে পারে।
-
ইলেকট্রনিক যুদ্ধ (Akash Tarang): ‘আকাশ তরঙ্গ’-এর মতো ব্যবস্থা শত্রুর ড্রোনের সিগন্যাল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যাম করে সেটিকে দিশেহারা করে ফেলে।
-
L-70 এয়ার ডিফেন্স গান: ড্রোন বধ করতে শত কোটি টাকার মিসাইল অপচয় না করে, আধুনিক ইলেকট্রো-অপটিক্যাল প্রযুক্তিসম্পন্ন L-70 গানের মাধ্যমে অত্যন্ত স্বল্প খরচে ড্রোন নামানো সম্ভব হচ্ছে।
উপসংহার:
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধুই ক্ষেপণাস্ত্রের নয়, বরং তথ্যের ও নিখুঁত সমন্বয়ের। রাডার, স্যাটেলাইট, লেজার, ই-ওয়ারফেয়ার এবং মিসাইলকে একটি ছাতার তলায় এনে ‘মিশন সুদর্শন চক্র’ যখন সম্পূর্ণ রূপ নেবে, তখন ভারতের আকাশসীমা ভেদ করা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।


