কলকাতা:
“যদি মানুষ হয়ে না পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন”—বছরের পর বছর আগে নিজের প্রিয় শহর কলকাতা ছাড়ার সময় এই আকুল আক্ষেপই ঝরে পড়েছিল লেখিকার কলমে। অবশেষে প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে নিজের চেনা শহর কলকাতায় ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন বিতর্কিত ও নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
দীর্ঘ ১৯ বছরের পর কলকাতায় পা রেখে হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি উজার করে দিয়ে তিনি বলেন,
“আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি—এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার ১৯ বছর লেগে গেল। এতদিন ধরে প্রতিদিন একটি করে ঠিকানা হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করেছি আমি।”
আরও পড়ুনঃ মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে সমাজবদল; সামাজিক রূপান্তর ও দূরদর্শনের নতুন দিগন্ত
‘তসলিমা’ শব্দের অর্থ অভিবাদন বা সেলাম। দীর্ঘ বিরতির পর লেখিকা যখন ‘পাখি’ না হয়ে সশরীরে তসলিমা হয়েই এই শহরে পা রাখলেন, তখন রবীন্দ্র সদন তাঁকে অভিবাদন জানাতে ভুল করেনি। আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে লেখিকাকে সংবর্ধনা জানান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সংবর্ধনা গ্রহণের পর মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্মৃতিভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন তসলিমা। অগস্ট মাসকে জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন:
-
প্রত্যাবর্তনের মাস: “আজ ১ অগস্ট। আমার জন্মের মাস, আমার দেশত্যাগের নির্বাসনের মাস এবং আজ থেকে এই অগস্টই হয়ে উঠল আমার প্রত্যাবর্তনের মাস।”
-
দেশকে ভেতর থেকে মোছা যায় না: “১৯৯৪ সালের ৮ অগস্ট তৎকালীন সরকার আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। আজ থেকে সাত দিন পর সেই নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হতো। রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু আমার ভেতর থেকে আমার দেশকে তো কেউ সরাতে পারেনি।”
-
ইউরোপের নাগরিকত্ব বনাম আপনত্ব: ইউরোপ তাঁকে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব দিলেও ‘আপনত্ব’ দিতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন—ঘর বা আপন আলয় কেবল নিরাপত্তা দিয়ে গড়ে ওঠে না, তা গড়ে ওঠে ভাষা, স্মৃতি এবং সংস্কৃতির অটুট টানে।
২০০৭ সালের স্মৃতি ও বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন
বক্তব্যে ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বরের ঘটনা স্মরণ করেন লেখিকা। তৎকালীন রাজ্য সরকারের নির্দেশে তাঁকে যেভাবে তড়িঘড়ি কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, সে কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তাঁর ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করা হলেও কলকাতা হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছিল। তবুও তৎকালীন সময়ে তোষণ ও মৌলবাদীদের চাপের মুখে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়।
বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে সওয়াল করে তসলিমা নাসরিন বলেন:
“আমি তো কোনো অপরাধ করিনি, কোনো আদালত আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে পা রাখার জন্য পুলিশ পাহারার প্রয়োজন হওয়াটা আমাদের সময়ের এক চরম বেদনাদায়ক সত্য। একজন লেখকের জীবন রক্ষা করার অর্থ হলো তাঁর কলম এবং বাকস্বাধীনতাকে রক্ষা করা।”
নিজের অপরাধের জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি যুক্ত করেন, “আমি পেশায় ডাক্তার ছিলাম, গল্প-কবিতা লিখেছি। আমি কেবল নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবাধিকারের কথা বলেছিলাম। যে বিধান মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেয়, তা বদলানোর সহজ দাবি তুলেছিলাম। আর এই সহজ কথাগুলো বলাকেই আমার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।”
দীর্ঘ সুদীর্ঘ সময় পর তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তন এবং রবীন্দ্র সদনের সভা আবারও সাহিত্য, রাজনীতি ও বাকস্বাধীনতার অধিকার নিয়ে নতুন করে দেশজুড়ে জোর আলোচনার জন্ম দিল।


