বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক:
আজ যখন আমরা মোবাইল অ্যাপ, লাইভ স্ট্রিমিং কিংবা ডিটিএইচ (DTH)-এর যুগে ৪K রেজোলিউশনে বিনোদন ও শিক্ষা উপভোগ করি, তখন থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে ভারতের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেসময় দেশের ৫ লক্ষেরও বেশি গ্রামে শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি ও কৃষিকাজের আধুনিক বার্তা পৌঁছানো সরকারের কাছে ছিল প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ।

পাহাড়, জঙ্গল আর বিস্তীর্ণ মরুভূমি পেরিয়ে প্রতিটি গ্রামে দূরদর্শনের টাওয়ার বসানো সময়সাপেক্ষ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছিলেন ভারতের আধুনিক মহাকাশ গবেষণার জনক ড. বিক্রম সারাভাই। তাঁর ঐতিহাসিক চিন্তাভাবনা এবং নাসা ও ইসরোর (NASA-ISRO) যৌথ প্রয়াসে জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম স্যাটেলাইটভিত্তিক শিক্ষামূলক পরীক্ষা—সাইট বা ‘SITE’ (Satellite Instructional Television Experiment)।
আরও পড়ুনঃ কেক কাটা আর মিষ্টি মুখ; মশাল মিছিল ও ফুটবল প্রেম; শিলিগুড়িতে লাল-হলুদ উদযাপন
‘SITE’ প্রকল্পের এক নজরে সারসংক্ষেপ
| নির্দেশক / ক্ষেত্র | বিবরণ / তথ্য |
| পুরো নাম | স্যাটেলাইট ইনস্ট্রাকশনাল টেলিভিশন এক্সপেরিমেন্ট (SITE) |
| মূল উদ্যোক্তা | ইসরো (ISRO), নাসা (NASA), দূরদর্শন ও অল ইন্ডিয়া রেডিও |
| সময়কাল | ১ আগস্ট, ১৯৭৫ – ৩১ জুলাই, ১৯৭৬ (টানা ১ বছর) |
| ব্যবহৃত উপগ্রহ | এটিএস-৬ (ATS-6: Applications Technology Satellite-6) |
| উপগ্রহের অবস্থান | ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার উঁচুতে (ভূস্থির বা Geostationary Orbit) |
| কভারেজ এলাকা | ৬টি রাজ্য (অন্ধ্র প্রদেশ, বিহার, কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশ, ওডিশা ও রাজস্থান)-র ২০টি জেলা |
| উপকৃত জনসংখ্যা | ২,৪০০-র বেশি গ্রামের প্রতিদিন প্রায় ২৮ লক্ষ মানুষ |
আরও পড়ুনঃ শ্যামপুকুরের ‘শশী’র নতুন পথ? দুই ডাক্তারের আচমকা সাক্ষাৎ; “এমনি ক্লিনিকে এলাম!”
কীভাবে কাজ করেছিল ৩৫,৭৮৬ কিমি দূরের প্রযুক্তির ম্যাজিক?
ইন্টারনেট, জিপিএস বা ডিজিটাল ব্যবস্থার অস্তিত্বহীন যুগে এই প্রযুক্তি ছিল এক যুগান্তকারী ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়:
-
উপগ্রহের ভূমিকা: নাসা তাদের অত্যানুধুনিক ATS-6 উপগ্রহটিকে ভারতের আকাশের একটি নির্দিষ্ট স্থানে ভূস্থির বা জিওস্টেশনারি কক্ষপথে স্থাপন করে।
-
সম্প্রচার প্রক্রিয়া: দিল্লি, মুম্বই, কটক ও হায়দরাবাদের স্টুডিও থেকে স্থানীয় ভাষায় নির্মিত কৃষি, শিক্ষা ও পুষ্টি সংক্রান্ত অনুষ্ঠান প্রথমে গ্রাউন্ড আর্থ স্টেশনে পাঠানো হতো। সেখান থেকে বার্তা যেত ৩৫,৭৮৬ কিমি দূরে মহাকাশে থাকা উপগ্রহে। উপগ্রহটি সংকেত গ্রহণ করে আবার সরাসরি ভারতের গ্রামগুলিতে ফিরিয়ে পাঠাত।
-
কমিউনিটি ডিসপ্লে: গ্রামগুলিতে ৩ মিটার ব্যাসের বিশেষ ডিশ অ্যান্টেনা এবং সাদা-কালো টিভি বসানো হয়েছিল। যেসব গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, সেখানে ব্যাটারির সাহায্যে টিভি চালানো হতো। সূর্যাস্তের পর প্রতিটি গ্রামে ৩-৪ শত মানুষ একত্রে বসে কমিউনিটি সেন্টারে সম্প্রচার দেখতেন।

সামাজিক রূপান্তর ও দূরদর্শনের নতুন দিগন্ত
‘সাইট’ প্রজেক্ট কেবল প্রযুক্তির প্রদর্শন ছিল না; এটি গ্রাম্য জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল:
-
কৃষি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা: কৃষকেরা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সার প্রয়োগ ও সেচ পদ্ধতি শেখেন। শিশুমৃত্যু রোধ, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং পারিবারিক স্বাস্থ্যের বহু প্রাথমিক শিক্ষা ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
-
ইনস্যাট (INSAT) ও আধুনিক দূরদর্শনের ভিত্তি: মাত্র এক বছরের এই সফল পরীক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীতে ভারত নিজের ইনস্যাট (INSAT) উপগ্রহ সিরিজ চালু করে এবং দেশব্যাপী দূরদর্শনের নেটওয়ার্ক প্রসারিত হয়।
ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তি যে কেবল রকেট বা কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সবচেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে—ড. বিক্রম সারাভাইয়ের সেই দূরদর্শী দর্শনকে বাস্তব রূপ দিয়েছিল এই ঐতিহাসিক ‘সাইট’ (SITE) প্রজেক্ট।


