বিশেষ উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধি:
উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স জুড়ে যখন শারদোৎসবের আধুনিক থিম ও আলোকসজ্জার রোশনাই, তখন জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির আমগুড়ি বাজার সংলগ্ন বসুনিয়া পরিবারে বহমান ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এক অনন্য লোকায়ত সংস্কৃতি। দীর্ঘ ২১৬ বছর ধরে এই পরিবারে মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা কোনো আড়ম্বরপূর্ণ রাজকীয় মূর্তিতে নয়; বরং উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের এক সাধারণ, কর্মঠ গৃহবধূর রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন—যাঁকে স্থানীয় মানুষ ভালোবেসে ডাকেন ‘দেবী ঠাকুরানি’।
আড়ম্বরহীন গ্রামীণ আভিজাত্য, মঙ্গোলীয় আদল এবং রাজবংশী লোকায়ত আচার-অনুষ্ঠানের মেলবন্ধনে বসুনিয়া বাড়ির এই পুজো আজও সমগ্র ডুয়ার্স অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
আরও পড়ুনঃ উগ্র ডানপন্থীদের বড় চমক; ব্রাজিলের ভোটে ‘ডানদিকে’ বইছে হাওয়া, বামপন্থীদের ধাক্কা
রাজবাড়ির প্রতিমা ও বসুনিয়া পরিবার: ঐতিহাসিক সূচনার প্রেক্ষাপট
১৮১০ সালে শুরু হওয়া এই প্রাচীন পুজোর সূচনার নেপথ্যে রয়েছে দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক জনশ্রুতি:
-
কোচবিহার রাজার আতিথ্য ও প্রতিমা স্থাপন: ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮১০ সালে কোচবিহারের রাজা প্রাণ নারায়ণ রংপুর থেকে দুর্গা প্রতিমা নিয়ে কোচবিহারে ফিরছিলেন। পথে ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে তিনি তৎকালীন চাপগড় পরগনায় আশ্রয় নেন। সেখানে রাজদরবারের হিসেবরক্ষক ধনবর বসুনিয়ার সনির্বন্ধ আমন্ত্রণে তাঁর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন রাজা। দুর্যোগের কারণে ধনবরের বাড়িতেই প্রতিমা রেখে মূল বিগ্রহ পুজো সম্পন্ন করা হয় এবং রাজবাড়িতে সে বছর হয়েছিল কেবল ঘটপুজো। সেই থেকেই বসুনিয়া বাড়িতে দেবী দুর্গার মূর্তিপুজোর ধারার সূচনা।
-
বিকল্প জনশ্রুতি: অন্য একটি গল্প মতে, ধনবর বসুনিয়া পূর্বে সপরিবারে কোচবিহারে থাকতেন। লুকিয়ে রাজবাড়ির পুজো দেখার অপরাধে তাঁকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হলে তিনি আমগুড়িতে এসে নিজ উদ্যোগে এই পুজোর সূচনা করেন। রাজকীয় আভিজাত্যের স্মারক হিসেবে রাজবাড়ির দেবী প্রতিমার বিশেষ গাত্রবর্ণ নিজের প্রতিমাতেও ধরে রাখেন তিনি।
সোনার গয়না নয়, পরনে ‘পাটানি’: দেবীর রূপ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য
আমগুড়ির ‘দেবী ঠাকুরানি’-র মূর্তির গঠন ও সজ্জায় রাজবংশী সংস্কৃতির গভীর প্রভাব স্পষ্ট:
-
মঙ্গোলীয় আদল ও সাধারণ পোশাক: দেবীর মূর্তিতে কোনো সোনার গয়নার জাকজমক নেই। প্রতিমার মুখে মঙ্গোলীয় জনজাতির সুস্পষ্ট ছাপ এবং গাত্রবর্ণ সামান্য লালচে। দশভুজা দেবী এখানে অত্যন্ত সাধারণ তাঁতের শাড়ি বা রাজবংশী নারীদের ঐতিহ্যবাহী ‘ফোতা’ কিংবা ‘পাটানি’ পরিহিত।
-
গ্রামীণ বধূর ভঙ্গি: গ্রামের বধূরা খেতে কাজ করার সময় পাছে শাড়ি ভিজে যায় বলে যেমন গোড়ালির ওপর তুলে কাপড় পরেন, দেবীকেও ঠিক সেই আদলে শাড়ি পরানো হয়। মাথায় থাকে রাজবংশী বধূদের ঐতিহ্যবাহী সুসজ্জিত মুকুট ‘শেয়ারা’।
আরও পড়ুনঃ ব্যক্তিগত রিপোর্ট কীভাবে প্রকাশ্যে আনা হল? নোটিস পাঠালেন মমতা
‘দধিকাদো’ থেকে ‘লাঙ্গল পুজো’: আচার ও লোকায়ত ঐতিহ্য
পুজোর প্রস্তুতি থেকে বিসর্জন—প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে বিশেষ লোকসংস্কৃতির ছোঁয়া:
| সময়কাল / পর্ব | পুজো আর্চা ও পালিত ঐতিহ্য |
| জন্মাষ্টমী | আয়োজিত হয় ‘কাদা খেলা’ বা দধিকাদো উৎসব। সেই খেলার ব্যবহৃত কাদামাটি দিয়েই দেবীর প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। |
| শিল্পীদের পুনর্বাসন | অতীতে রংপুর থেকে মৃৎশিল্পী এবং অসম থেকে ঢাকি ও পুরোহিত আনা হতো। পরবর্তীতে ধনবরের ছেলে মুসব্বর বসুনিয়া তাঁদের আমগুড়িতে নিজস্ব জমি দিয়ে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। |
| নবমী ও ‘মাত্রা পুজো’ | মূল পুজোর আগে শিব বা ‘গ্রামঠাকুর’-এর পুজো করা হয়। নবমীর দিন গৃহবধূরা ফলের সাথে লাঙ্গল পুজো করেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘মাত্রা পুজো’ নামে পরিচিত। |
| দশমী ও অপৌত্তলিক বিসর্জন | মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর বিসর্জন ঘটলেও প্রতিমা জলে নিরঞ্জন করা হয় না। দশমীর দিন পুজো করা লাঙ্গল দিয়ে জমিতে আড়াই পাক চাষ করে রবিশস্য রোপণের শুভ সূচনা করা হয়। |
আমগুড়ির বসুনিয়া বাড়ির এই প্রাচীন পুজো কেবল কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ডুয়ার্সের বুক আগলে রাখা রাজবংশী সমাজকৃষ্টি, ইতিহাস ও সাধারণ মানুষের জীবনালেখ্যের এক অমর দলিল।


