শারদীয়া দুর্গাপূজা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ষষ্ঠী থেকে দশমীর দিনগুলি। কিন্তু শাস্ত্র ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে দেবী দুর্গার ‘মহাপূজা’ কেবল চার-পাঁচ দিনের উৎসব নয়; পারিবারিক কুলপ্রথা, সামর্থ্য ও সংকল্পভেদে এই পূজা ১ দিন থেকে শুরু করে ১৬ দিন পর্যন্ত পালিত হতে পারে।
শাস্ত্রীয় বিধানে এই বৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি হলো ‘কল্পারম্ভ’। সহজ কথায়, পূজার সূচনায় কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ফললাভের উদ্দেশ্যে দেবীকে আবাহন করার যে শাস্ত্রীয় সংকল্প, তাকেই বলা হয় কল্পারম্ভ।
আরও পড়ুনঃ মহালয়ায় ইডেনে থাকছেন না মোদী-শাহ; ছাঁটা হচ্ছে জমকালো সরকারি অনুষ্ঠান
দুর্গাপূজার বিভিন্ন কল্প ও সময়সীমা
দেবীপুরাণ ও শ্রীশ্রীদুর্গাপূজাতত্ত্ব অনুযায়ী শারদীয়া দুর্গাপূজায় মোট সাতটি প্রধান কল্প প্রচলিত রয়েছে:
| কল্পের নাম | পূজার সূচনা ও সময়সীমা | বিশেষত্ব ও বৈচিত্র্য |
| ১. কৃষ্ণানবম্যাদি কল্প | ১৬ দিন (কৃষ্ণা নবমী থেকে শুক্লা নবমী) | ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা নবমী তিথিতে এই কল্পের সূচনা হয়। শোভাবাজার রাজবাড়ি সহ কিছু প্রাচীন অভিজাত পরিবারে এই দীর্ঘ ১৬ দিনের পূজা পালিত হয়। |
| ২. প্রতিপত্যাদি কল্প | ১০ দিন (মহালয়ার পরদিন প্রতিপদ থেকে) | দেবীপক্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ তিথি থেকে শুরু হয়ে মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমী ব্যাপ্ত করে চলে। |
| ৩. ষষ্ঠ্যাদি কল্প | ৪ দিন (মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী) | অধিকাংশ বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজায় এই বিধান মেনে মহাষষ্ঠীর সায়ংকালে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে কল্পারম্ভ হয়। |
| ৪. সপ্তম্যাদি কল্প | ৩ দিন (মহাসপ্তমী থেকে মহানবমী) | মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা প্রবেশ ও প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর মূল পূজার সংকল্প করা হয়। |
| ৫. অষ্টম্যাদি কল্প | ২ দিন (মহাঅষ্টমী ও মহানবমী) | সময় বা সামর্থ্যের অভাবে কেবল মহাঅষ্টমী ও মহানবমী—এই দুই দিন ব্যাপ্ত করে কল্প গ্রহণ করা হয়। |
| ৬. কেবল-অষ্টমী কল্প | ১ দিন (মহাঅষ্টমী) | কেবল মহাঅষ্টমীর দিনে স্নান, পূজা, বলিদান ও হোম সম্পন্ন করে সংকল্প শেষ করা হয়। |
| ৭. কেবল-নবমী কল্প | ১ দিন (মহানবমী) | বিশেষ পারিবারিক রীতিতে কেবল মহানবমীর একটি মাত্র তিথিতে পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপূজা সম্পন্ন করা যায়। |
কৃষ্ণা নবমী ও উগ্রচণ্ডা রূপের সূচনা
কৃষ্ণা নবমী তিথির গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রীশ্রীচণ্ডী ও কালিকাপুরাণ মতে, দেবী তিন কল্পে বা তিন সৃষ্টিতে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন:
-
আদি সৃষ্টিতে উগ্রচণ্ডা: আঠারো হাত (অষ্টাদশভুজা), কাজলের মতো ঘোর কৃষ্ণবর্ণের ও ভীষণদর্শনা রূপ। কথিত আছে, ভাদ্রের এই কৃষ্ণা নবমী তিথিতেই কোটি যোগিনী পরিবৃত্ত হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন ‘উগ্রচণ্ডা’। তাই এই দিনেই প্রথম বোধন ও কল্পারম্ভ করা হয়।
-
পরবর্তী কল্পে ভদ্রকালী ও দুর্গা: দ্বিতীয়বার ষোড়শভুজা ‘ভদ্রকালী’ এবং তৃতীয়বার আমাদের সুপরিচিত দশভুজা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ রূপে দেবী অসুর বধ করেন।
আরও পড়ুনঃ প্রহসনের উপনির্বাচন দেখছে বাংলা; ভোট লুট শুরু, বিজেপির মুকুটে নতুন পালক
কুলপ্রথা বনাম সামর্থ্য
শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, দুর্গাপূজার ক্ষেত্রে কৃপণতা বা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সংক্ষিপ্ত আয়োজন অনুচিত বলা হলেও—পারিবারিক ঐতিহ্য ও সময়ানুসারী নিয়মই এখানে মুখ্য। যেখানে দীর্ঘ ১৬ দিনের আরাধনায় প্রতিদিন চণ্ডীপাঠ, ধূপ-দীপ, নিত্যপূজা ও চালচিত্র রূপায়নের এক বিপুল ব্যয়ভার ও কঠোর নিষ্ঠা জড়িত থাকে, সেখানে বারোয়ারি পুজোতে প্রধানত মহাষষ্ঠীর কল্পারম্ভকেই মান্যতা দেওয়া হয়।
কলিযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ নিষিদ্ধ হওয়ায় শারদীয়া মহাপূজাকেই অশ্বমেধের সমতুল্য ফলদায়ী বলে মনে করেন পণ্ডিতেরা। আজ ভাদ্রের কৃষ্ণা নবমীতে কল্পারম্ভের মাধ্যমে ঢাকের কাঠি না বাজলেও শাস্ত্রমতে শারদীয়া পূজার শুভ সূচনা ঘটে গেল।


