বিশেষ আঞ্চলিক প্রতিনিধি:
শরতের সোনাঝরা রোদে যখন গোটা বাংলা উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন হাওড়া জেলার সাঁকরাইলের রাজগঞ্জে গঙ্গার তীরে ঐতিহ্যবাহী পালবাড়িতে শুরু হয়ে গিয়েছে উমা আবাহনের তোড়জোড়। প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এই জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো কেবল আভিজাত্য আর জৌলুসের সাক্ষী নয়, তার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতি-দুর্যোগের ঘাত-প্রতিঘাত এবং এক চরম হৃদয়বিদারক বিষাদের ইতিহাস।
আন্দুল রাজবাড়ির অত্যন্ত বিশ্বস্ত দেওয়ান রাজা রাম পালকে সন্তুষ্ট হয়ে রাজগঞ্জ এলাকায় জমিদারি প্রদান করেছিলেন তত্কালীন রাজা। গঙ্গার ধারেই গড়ে উঠেছিল তাঁদের প্রথম বাসভবন। তবে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও ভয়াবহ ভূমিকম্পে সেই আদি বাড়ি গঙ্গার পেটে তলিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালের পর রাজা রাম পালের ছেলে রামধন পাল পুরনো বাসভবনের অনতিদূরে নির্মাণ করেন নতুন অট্টালিকা ও বিশাল নাটমন্দির, যার নামকরণ করা হয় নিজের ছেলে ললিতের নামে—‘ললিত লজ’।
আরও পড়ুনঃ ‘ঘর মে ঘুসকে মারা’ নাম না করে পাকিস্তানকে বার্তা মোদির
মহাঅষ্টমীতেই সিঁদুর খেলা: ১৮ বছরের তরুণের করুণ ইতিহাস
সারা বাংলায় বিজয়া দশমীর দিন দেবী বরণের পর সিঁদুর খেলার প্রথা থাকলেও পালবাড়ির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পরিবারে মহাঅষ্টমীর দিনই সম্পন্ন হয় সিঁদুর খেলা।
-
মর্মান্তিক অতীত: রামধন পালের জ্যেষ্ঠ পুত্র ললিতচন্দ্র পাল মাত্র ১৮ বছর বয়সে মহাঅষ্টমীর পুজো চলাকালীনই অকালে প্রাণ হারান।
-
মৃত্যু ও প্রতিমা আরাধনা: বাড়ির বড় ছেলের অকালমৃত্যুতে পরিবারে কান্নার রোল উঠলেও দেবীর আরাধনা সচল রাখতে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ললিতের মৃতদেহ বাড়িতে রেখেই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অষ্টমী, নবমী ও দশমীর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন পরিবারের সদস্যরা।
-
ঐতিহ্যের রূপান্তর: শোকের সেই কালো দিনটিকে স্মরণ করতেই বংশপরম্পরায় আজ প্রায় দু’শো বছর ধরে দশমীর বদলে মহাঅষ্টমীর দিনই পালবাড়িতে সিঁদুর খেলার আবেগঘন প্রথা পালিত হয়ে আসছে।
বৈষ্ণব রীতিনীতি ও কঠোর নিরামিষের নিয়ম
ললিত লজে দেবী দুর্গা কোনো গম্ভীর মহাশক্তি নন, বরং ঘরের আদুরে মেয়ে ‘উমা’ রূপে পূজিতা হন। বৈষ্ণব ভাবধারার পুজো হওয়ায় এখানে কোনো প্রকার পশুবলির রেওয়াজ নেই।
| পুজোর পর্যায় | বৈশিষ্ট্য ও পালিত নিয়মকানুনের বিবরণ |
| সূচনা ও ঘটপুজো | রথযাত্রা বা জন্মাষ্টমীর দিন দেবীর কাঠামো পুজোয় ঢাকে কাঠি পড়ে। মহালয়ার পরদিন (প্রতিপদ) থেকে ঘটস্থাপন ও চণ্ডীপাঠ শুরু হয়। |
| আহারের নিয়ম | বর্তমান প্রজন্মের সদস্য স্বরূপ পাল জানান, ষষ্ঠী থেকে দশমীতে দেবীর ঘটের সুতো কাটা পর্যন্ত পরিবারের প্রতিটি সদস্য কঠোর নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। |
| বিশেষ আয়োজন | নবমী তিথি শেষ হওয়ার আগেই নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয় কুমারী পুজো। |
দেবত্তর ট্রাস্টের সুরক্ষা ও সার্বজনীন সম্প্রীতি
কালের নিয়মে বহু জমিদার বাড়ির জৌলুস আর্থিক সংকটে ম্লান হলেও পালবাড়ির আভিজাত্য আজও অটুট। পরিবারের দূরদর্শী পূর্বপুরুষ নফরচন্দ্র পাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাবলম্বী দেবোত্তর ট্রাস্ট গঠন করে যান। সেই দেবোত্তর সম্পত্তির আয় থেকেই গৃহদেবতা শ্রীধর জীউ-সহ দুর্গা, কালী ও লক্ষ্মীপুজোর সমস্ত ব্যয়ভার অনায়াসে নির্বাহ হয়।
অষ্টমীর দিন বিশেষ ভোগ রান্না করে গোটা গ্রামের মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। পুজোর ক’দিন আলোয় ঝলমল করে ওঠে পুরো ‘ললিত লজ’।
আরও পড়ুনঃ কোমরে শাড়ি গুঁজে খালি পায়েই বাজিমাৎ! ৭ মিনিটে ১৬০০ মিটার অতিক্রম ঝাড়খণ্ডের গৃহবধূর
কীভাবে পৌঁছাবেন ‘ললিত লজ’-এ?
-
রুট ১ (বাসে): হাওড়া স্টেশন থেকে সাঁকরাইলগামী বাসে উঠে সোজা নেমে পড়ুন ‘রাজগঞ্জ শীতলাতলা’ বাস স্টপেজে। সেখান থেকে অল্প কিছুটা পায়ে হেঁটে গঙ্গার পাড়েই প্রাচীন পালবাড়ি।
-
রুট ২ (অটোয়): আন্দুল বাজার থেকে অটো ধরে বানিপুর, সেখান থেকে অন্য অটো বদলে রাজগঞ্জ শীতলাতলায় নেমে অনায়াসে পৌঁছে যান এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িতে।


