বিশেষ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক প্রতিবেদন:
নদীয়ার শান্তিপুর বললেই চোখে ভাসে তাঁতের শাড়ি, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদধূলিধন্য ধাম কিংবা রাসউৎসবের জমকালো বৈচিত্র্য। তবে এই বৈষ্ণব সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রেই লুকিয়ে রয়েছে সাড়ে পাঁচশো বছরের এক অত্যন্ত জাগ্রত ও গা ছমছমে শাক্ত ঐতিহ্য—‘মা মহিষখাগী কালীবাড়ি’। একদিকে তান্ত্রিক সাধনার পঞ্চমুণ্ডির আসন, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বলিদান পর্বের ইতিহাস, আর অন্যদিকে বিসর্জনের আগে বিয়ের কনের মতো অনন্য বাঙালি প্রথা—সব মিলিয়ে মহিষখাগী মায়ের পুজো বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অদ্ভুত নিদর্শন।
আরও পড়ুনঃ পাতকুয়োর অন্ধকারে আরাধ্যা দেবী! দক্ষিণ কলকাতার ‘ছানা কালী’ ও মনোহর ডাকাতের অজানা কাহিনী
পঞ্চমুণ্ডির আসন ও নামগ্রহণের ইতিহাস
আজ থেকে প্রায় ৫০০-৫৫০ বছর আগে শান্তিপুরের এক নিঃসঙ্গ ও নির্জন প্রান্তরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে কঠোর সাধনা করতেন এক সিদ্ধ তান্ত্রিক।
-
দেবীর দর্শন ও স্বপ্নাদেশ: সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে দর্শন দেন এবং একটি বিশেষ নির্দেশ দান করেন। আদেশ ছিল—দেবীকে মহিষের রক্ত নিবেদন করে পুজো করতে হবে।
-
‘মহিষখাগী’ নামকরণ: মহিষ বলির এই বিশেষ অনুশাসন এবং রক্ত গ্রহণের কারণে পরবর্তীতে লোকমুখে দেবীর নাম হয়ে যায় ‘মা মহিষখাগী’। তান্ত্রিকের প্রয়াণের পর স্থানীয় এক ব্রাহ্মণ পরিবার এই পুজোর দায়িত্বে আসে এবং বর্তমানে তা বারোয়ারি বা সর্বজনীন কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও পুজোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করার গল্প
মহিষখাগী মায়ের পুজোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে নদীয়ার বিখ্যাত মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের নাম।
-
৮টি মহিষ বলির কর্মযজ্ঞ: প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার মায়ের কাছে ৮টি বিশাল মহিষ বলির মানসিক নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আট-আটটি মহিষ বলির সেই দীর্ঘ ও জটিল আচার অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত পার হয়ে প্রায় ভোর হয়ে আসে।
-
দুই পর্বে পুজো ভাগ: সময়ের এই টানাটানির কারণেই পরবর্তীতে এই পুজোকে দুটি সুনির্দিষ্ট পর্বে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়—বলির পূর্ব পর্যন্ত পুজোর ‘প্রথম পর্ব’ এবং বলির পরবর্তী সময় থেকে বাকি আচার নিয়ে ‘দ্বিতীয় পর্ব’।
আরও পড়ুনঃ অপঘাতে মৃত যুগলের অস্থি ও করোটিতে নির্মিত বিগ্রহ; মেদিনীপুরের মহতাবপুর পদ্মাবতী মহাশ্মশানের অলৌকিক ‘মা উগ্রতারা তন্ত্রপীঠ’
সাধারণ পুজো নয়, দেবীর আরাধনা ‘বিয়ে’র নিয়মে!
মহিষখাগী মায়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর ধর্মীয় আচারের ধরণ। প্রচলিত কোনো সাধারণ কালীপুজোর মতো নয়, বরং মা এখানে পূজিতা হন এক বাঙালি হিন্দু কনের মতো বিবাহরীতি মেনে!
-
দধিমঙ্গল ও মূল পুজো: দেবীকে প্রথম পাটে তোলার পর পুরো মন্দির চত্বর ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয় এবং ভোররাতে কনের মতো নিয়ম মেনে মায়ের ‘দধিমঙ্গল’ সম্পন্ন করা হয়। অমাবস্যা তিথি শুরু হলে সম্পূর্ণ বিয়ের নিয়মকানুন অনুসরণ করে দেবীর মূল পুজো শুরু হয়।
-
বাসি বিয়ে ও ভোগ: পুজো শেষের পরের দিন মহাসমারোহে পালিত হয় ‘বাসি বিয়ে’-র প্রথা।
-
বলিদান বন্ধ ও বিশেষ নিবেদন: একসময়ে মহারাজার হাত ধরে মহিষ বলি হলেও বহু বছর আগেই বলির প্রথা চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে বলির পরিবর্তে বিসর্জনের আগে মাকে পরম ভক্তিতে পান্তাভাত, খয়রা মাছ ও রুই মাছের বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়।
-
কাঁধে চেপে নিরঞ্জন: বিসর্জনের দিনে দেবীকে কোনো লরি বা গাড়িতে চাপানো হয় না; হাজার হাজার ভক্ত নিজেদের কাঁধে প্রতিমা বহন করে গঙ্গায় নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যান।
কীভাবে পৌঁছাবেন মহিষখাগী কালীবাড়ি?
-
রেলপথে: শিয়ালদহ স্টেশন (Sealdah) থেকে সরাসরি শান্তিপুরগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে উঠে শেষ স্টেশন শান্তিপুরে নেমে পড়ুন। স্টেশনের বাইরে থেকে টোটো বা অটো ধরে সরাসরি ‘মহিষখাগী কালীবাড়ি’ বললেই পৌঁছে যাওয়া যাবে।
-
সড়কপথে: ৩৪ নম্বর (বর্তমানে ১২ নম্বর) জাতীয় সড়ক ধরে রানাঘাট পেরিয়ে খুব সহজেই শান্তিপুর শহরে প্রবেশ করে মন্দিরে পৌঁছানো যায়।


