বিশেষ আন্তর্জাতিক ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি প্রতিবেদন:
মহাকাশ বিজ্ঞানে আরও এক বিরাট সাফল্যের দাবি করল চিন (China)। পৃথিবীর কক্ষপথে প্রদক্ষিণরত অকেজো হয়ে যাওয়া স্যাটেলাইটগুলিতে এবার মহাকাশেই সরাসরি জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি সফলভাবে পরীক্ষার কথা ঘোষণা করল বেজিং। চিনের ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন ল্যাবরেটরি এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের গবেষকদের এই উদ্ভাবন মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যতকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মহাকাশে ভ্রাম্যমাণ ‘পেট্রোল পাম্প’ বা জ্বালানি সরবরাহকারী স্যাটেলাইট তৈরি করে উপগ্রহগুলির আয়ু দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা নিয়েছে ‘ড্রাগন’ দেশ।
আরও পড়ুনঃ উৎসবের মরশুমের মুখেই কোপ! আজ থেকে আবার বাড়ল এলপিজি সিলিন্ডারের দাম
স্যাটেলাইটের আয়ু ফুরোনোর চিরন্তন সমস্যার সমাধান
সাধারণত যেকোনো স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর তার নির্দিষ্ট কর্মক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ বা লাইফস্প্যান থাকে।
-
জ্বালানি ফুরোলেই অকেজো: উপগ্রহের ক্যামেরা, সেন্সর, সোলার প্যানেল কিংবা অন্যান্য বৈদ্যুতিন যন্ত্রাংশ পুরোপুরি সচল বা ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি আর কক্ষপথে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। ফলস্বরূপ, কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি সেই স্যাটেলাইটটি মহাকাশে একটি ‘স্পেস ড্রিফট’ বা অকেজো বর্জ্য হিসেবে ঘুরতে থাকে।
-
মহাকাশের পেট্রোল পাম্প: এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবেই মহাকাশে ভ্রাম্যমাণ ফুয়েল ট্যাঙ্কার বা জ্বালানি সরবরাহকারী স্যাটেলাইট তৈরির পরিকল্পনা করেছে চিন। প্রয়োজন অনুযায়ী এই বিশেষ স্যাটেলাইট অন্য একটি উপগ্রহের কাছে গিয়ে যুক্ত হবে এবং বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে ফুয়েল পোর্টে জ্বালানি স্থানান্তর করবে।
১৪২ কেজি জ্বালানি স্থানান্তরের সফল পরীক্ষা
চিনা গবেষকদের দাবি, এই যুগান্তকারী প্রযুক্তির ল্যাবরেটরি ও কক্ষপথের পরীক্ষায় দারুণ সাফল্য মিলেছে।
-
শিজিয়ান-২৫ ও বেইদৌ-২ জি৭-এর সংযোগ: চিনের ‘শিজিয়ান-২৫’ (Shijian-25) নামের একটি সার্ভিসিং স্যাটেলাইট পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে থাকা চিনের নিজস্ব ‘বেইদৌ-২ জি৭’ (Beidou-2 G7) নেভিগেশন স্যাটেলাইটের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সংযুক্ত হয়।
-
জ্বালানি বৃদ্ধি ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি: ওই সংযোগের পর বেইদৌ উপগ্রহটিতে সফলভাবে প্রায় ১৪২ কেজি জ্বালানি স্থানান্তর করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, এই অতিরিক্ত জ্বালানির জেরে ওই নেভিগেশন স্যাটেলাইটটির কার্যকরী আয়ু এক ধাক্কায় প্রায় আট বছর বেড়ে গিয়েছে।
অক্টোপাসের মতো নমনীয় রোবোটিক বাহুর কামাল
মহাকাশে ঘণ্টায় হাজার হাজার কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণায়মান দুটি স্যাটেলাইটকে মহাশূন্যে নিখুঁতভাবে সংযুক্ত করা এক অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক প্রযুক্তিগত কাজ। এই প্রক্রিয়াটি মসৃণ করতে অভিনব রোবোটিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছে চিন।
-
গবেষকদের মতে, ‘ইউশিং-৩০৬’-এর মতো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটে বিশেষ নমনীয় রোবোটিক বাহু (Flexible Robotic Arm) ব্যবহার করা হয়েছে।
-
সমুদ্রের অক্টোপাসের বাহুর মতো যেকোনো দিকে বাঁকতে ও ঘুরতে সক্ষম এই অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যেই লক্ষ্য স্যাটেলাইটের ক্ষুদ্র ফুয়েল কানেকশন পোর্ট বা সংযোগস্থলটি শক্ত করে ধরে জ্বালানি স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে।
-
এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় (Automated) ব্যবস্থায় যেমন পরিচালিত হতে পারে, তেমনই পৃথিবীর মাটিতে থাকা কন্ট্রোল রুমের বিজ্ঞানীরা লাইভ ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি নজরদারি ও প্রয়োজনে ম্যানুয়াল নির্দেশও দিতে পারবেন।
আরও পড়ুনঃ দেবভূমিতে চরম বিপদ! ধসের আশঙ্কায় কাঁপছে বদ্রীনাথ ধাম; বিপদে প্রায় ৪০০ বাড়ি
ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণায় এর প্রভাব
চিনের এই প্রযুক্তি যদি নিয়মিত এবং বাণিজ্যিকভাবে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বৈশ্বিক মহাকাশ গবেষণায় এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসবে। আগামী দিনে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে নতুন স্যাটেলাইট পাঠানোর খরচ যেমন কমবে, তেমনই যোগাযোগ, নেভিগেশন (যেমন জিপিএস বা বেইদৌ) এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত মূল্যবান স্যাটেলাইটগুলিকে যুগ যুগ ধরে সচল রাখা সম্ভব হবে।


