বিশেষ পরিবেশ ও ভৌগোলিক প্রতিবেদন:
উত্তরাখণ্ডের পবিত্র দেবভূমি বদ্রীনাথ ধামকে ঘিরে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপদের সংকেত সামনে এল। হিমালয়ের কোলে ওপরের দিকে ঝুলে থাকা প্রাচীন হিমবাহ বা হ্যাঙ্গিং গ্লেসিয়ার (Hanging Glacier) গলে বা ভেঙে যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে প্রলয়ঙ্করী বরফধস। আর এই ধসের জেরে বদ্রীনাথ শহরের কয়েকশো বাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ উৎসবের মরশুমের মুখেই কোপ! আজ থেকে আবার বাড়ল এলপিজি সিলিন্ডারের দাম
কী বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা?
‘Vulnerability Assessment of Hanging-Glacier Avalanches in Badrinath Township, Central Himalayas, India’ শীর্ষক ওই গবেষণাটি মূলত বদ্রীনাথ শহরের ঠিক আশপাশে অবস্থিত তিনটি ঝুলন্ত হিমবাহকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে।
-
উপগ্রহ চিত্রের সাহায্য: গবেষকরা স্যাটেলাইট ইমেজ এবং বিভিন্ন আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করেছেন যে, পাহাড়ের কোন অংশ থেকে বরফ ভেঙে নিচে আছড়ে পড়তে পারে এবং তার সম্ভাব্য আয়তন কত হতে পারে।
-
সিমুলেশন মডেল: বরফধসের গতিপথ ও তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘র্যাপিড মাস মুভমেন্ট সিমুলেশন’ (Rapid Mass Movement Simulation) মডেল। ধসের গতি কম, মাঝারি এবং বেশি—এই তিনটি আলাদা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা হয়েছে বরফ কত দূর পর্যন্ত এগিয়ে আসতে পারে।
-
ঝুঁকির কারণ: বিজ্ঞানীদের মতে, বরফধসের গতি ও বিস্তৃতি প্রধানত নির্ভর করে ভেঙে পড়া বরফের পরিমাণ, পাহাড়ের খাড়া ঢাল এবং নীচের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের ওপর। বরফের পরিমাণ বেশি হলে এবং ঢাল বেশি খাড়া থাকলে এই ধস মুহূর্তের মধ্যে মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে।
বদ্রীনাথের কোন এলাকায় বিপদের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?
গবেষণায় চিহ্নিত তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানটিকে (Site 2) সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। এই নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে ধস নামলে তার ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে:
-
প্রায় ৩৯৮টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
-
২.৬৬ কিলোমিটার রাস্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন পরিকাঠামো ভেঙে পড়তে পারে।
-
৩.৮৭ হেক্টর কৃষিজমি এবং ১৫.৫৭ হেক্টর বনভূমি বরফের নিচে চাপা পড়তে পারে।
-
এছাড়া এই সম্ভাব্য বিপদের জোনের মধ্যে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ হেলিপ্যাড এবং বেশ কয়েকটি বড় পার্কিং এলাকা, যা ধ্বংস হলে উদ্ধারকাজ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বিক্ষোভ করুন, তারপরে শপিং-ও! কর্মসূচির আগেই আবদার রাহুলের
বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা ও আগাম প্রস্তুতির পরামর্শ
বদ্রীনাথ ভারতের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। প্রতি বছর এখানে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ও পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন। তাই এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এড়াতে আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার জোরদার আর্জি জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা:
১. বিস্তারিত সমীক্ষা: প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য আলাদা করে বিশদ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানো।
২. আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম: বরফধস নামার ঠিক আগে তা টের পাওয়ার জন্য আধুনিক আগাম সতর্কবার্তা বা আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (Early Warning System) চালু করা।
৩. নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ: বিপজ্জনক এবং সংবেদনশীল পাহাড়ি এলাকায় যত্রতত্র বহুতল বা অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ওপর কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা।
৪. জনসচেতনতা: স্থানীয় বাসিন্দা ও তীর্থযাত্রীদের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং দুর্যোগকালীন মহড়া বা প্রিপেয়ার্ডনেস বজায় রাখা।
দেবভূমির এই ঐতিহাসিক জনপদকে রক্ষা করতে এখন থেকেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ না নিলে বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বদ্রীনাথ।


