বিশেষ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও পর্যটন সংক্রান্ত প্রতিবেদন:
“পথিক, তুমি পথ হারাইছ?”—বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের এই অবিস্মরণীয় সংলাপের শিকড় লুকিয়ে আছে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমার দেশপ্রাণ ব্লকের অন্তর্গত দরিয়াপুর গ্রামে। রসুলপুর নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার কাছে বালিয়াড়ির কোলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ও রহস্যময় ‘কপালকুণ্ডলা মন্দির’ সাহিত্য এবং বাস্তব ইতিহাসের এক দুর্লভ সন্ধিক্ষণ।
আরও পড়ুনঃ ‘মা জগদ্ধাত্রী’ থেকে ‘রানিমা-মিষ্টিমা’! জগদ্ধাত্রী পুজো বনাম বর্তমানের নামের ট্রেন্ড
১. উপন্যাসের পটভূমি ও বঙ্কিমচন্দ্রের দরিয়াপুর আগমন
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তৎকালীন নেগুয়া (কাঁথি) মহকুমায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে মাত্র ৯ মাসের জন্য কর্মরত ছিলেন।
-
তদন্ত সূত্রে আগমন: একটি ডাকাতির মামলার তদন্তে তিনি দেশপ্রাণ ব্লকের দরিয়াপুর গ্রামে আসেন।
-
প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব: রসুলপুর নদীর মোহনা, নির্জন বালিয়াড়ি, তান্ত্রিকদের সাধনা এবং সমুদ্রের বন্য সৌন্দর্য তাঁর মানসপটে গভীর প্রভাব ফেলে। এই পটভূমিতেই ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাস ‘কপালকুণ্ডলা’।
২. মন্দির নির্মাণের ইতিহাস: ভৈরবী মন্দির থেকে লোকবিশ্বাসের কপালকুণ্ডলা
উপন্যাসটি প্রকাশের পূর্বে দরিয়াপুরে ‘কপালকুণ্ডলা মন্দির’ নামে কোনো মন্দিরের পৃথক অস্তিত্ব ছিল না।
-
ঐতিহাসিক সত্যি: গবেষকদের মতে, এটি মূলত স্থানীয় পড়িয়ারি পরিবারের আরাধ্যা দেবী ভৈরবীর (বা চণ্ডীর) প্রাচীন মন্দির ছিল, যা কাঁথির কিশোর নগর গড় রাজবাড়ির রাজা যাদব রামরায় প্রতিষ্ঠা বা সংস্কার করেছিলেন।
-
লোকবিশ্বাসের রূপান্তর: উপন্যাসটি চরম জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর স্থানীয় আবেগ ও সাহিত্যের বিবরণ মিলেমিশে দেবী ভৈরবীর এই মন্দিরটিই ‘কপালকুণ্ডলা মন্দির’ নামে খ্যাত হয়। ১৯তম বংশধরেরা আজও এই পরিবারের সেবায়েত হিসেবে যুক্ত।
-
প্রাচীন খড়্গ: মন্দিরে রক্ষিত একটি প্রাচীন খড়্গকে কেন্দ্র করে লোকবিশ্বাস রয়েছে যে, এই খড়্গ দিয়েই কপালকুণ্ডলা কাপালিকের বলির হাত থেকে নবকুমারকে রক্ষা করেছিল।
৩. হেরিটেজ সংস্কার ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো এই স্থাপত্যটি দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গলাকীর্ণ ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল।
-
হেরিটেজ তকমা: রাজ্য হেরিটেজ কমিশন ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে মন্দিরটির সংস্কার করে এবং এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হেরিটেজ’ স্থান হিসেবে ঘোষণা করে।
-
বিগ্রহ ও উৎসবের বর্তমান অবস্থা: হেরিটেজ দপ্তর থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিকাঠামো সংস্কার করা হলেও প্রাচীন মূল মন্দিরে স্থায়ী বিগ্রহ না থাকায় গ্রামবাসীরা কাঁথি-পেটুয়াঘাট মূল রাস্তার পাশে নতুন কপালকুণ্ডলা মন্দির গড়ে তুলেছেন। কালীপুজোর রাতে মূল হেরিটেজ মন্দিরে দীপাবলির প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানো হয় এবং প্রথাগত পুজো ও মায়ের আরাধনা মহাসমারোহে সম্পন্ন হয় স্থানীয়দের তৈরি নতুন মন্দিরে।
আরও পড়ুনঃ ৪৫০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও গা-ছমছমে মেদিনীপুরের লচি পোদ্দার কালীবাড়ি
৪. ভ্রমণ নির্দেশিকা (কীভাবে পৌঁছাবেন)
-
রেলপথে: হাওড়া থেকে দীঘাগামী তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস বা কান্ডারী এক্সপ্রেসে উঠে কাঁথি (Contai) স্টেশনে নামতে হবে। কাঁথি স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো, টোটো বা ট্রেকার ভাড়া করে দেশপ্রাণ ব্লকের পেটুয়াঘাট রাস্তা ধরে দরিয়াপুর গ্রামে পৌঁছানো যায়।
-
সড়কপথে: কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ধরে কোলাঘাট ও নন্দকুমার হয়ে কাঁথি পৌঁছাতে হবে। কাঁথি শহর থেকে পেটুয়াঘাটগামী রাস্তায় ড্রাইভ করে সহজে পৌঁছানো যায় দরিয়াপুর কপালকুণ্ডলা মন্দিরে।


