বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন:
নেপালের ভয়াল অভিজ্ঞতার রেশ মেলাতে না মেলাতেই এবার প্রকৃতির রুদ্ররূপের মুখে পাহাড়ি রাজ্য ভুটান। তিব্বত লাগোয়া লায়া অঞ্চলে ভুটানের অন্যতম বিপজ্জনক তালিকায় থাকা শিনটাফু (Shintaphu) হিমবাহ হ্রদ ফেটে ঘটল ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF)। প্রাচীর ভেঙে প্রায় ৭৪ লক্ষ ঘনমিটার জল, কাদা ও পাথরের সুবিশাল ধ্বংসাবশেষ হুড়মুড়িয়ে নেমে এসেছে উজান পাহাড়ি নদী ‘মো চু’ (Mo Chhu)-তে।
রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে বেজে উঠেছে সতর্কতার সাইরেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছেন ভুটানের বাসিন্দারা। ভুটানের এই বানের জল সরাসরি ভারতে প্রবেশ করার মুখে থাকায় চরম উদ্বেগে রাত জেগেছে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং সংলগ্ন অসমের ধুবড়ি জেলা।
ভুটানের হড়পা বানের গতিপথ: কেন আশঙ্কায় বাংলা ও অসম?
ভুটানের পাহাড়ি নদী ‘মো চু’ পরবর্তীতে আরও কয়েকটি স্রোতস্বিনীর সঙ্গে মিশে পুনাসাংচু নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। এই পুনাসাংচু নদীই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে পশ্চিমবঙ্গ ও অসম সীমান্তে সঙ্কোশ নদী (Sankosh River) নামে পরিচিত।
-
জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ ও জল ছাড়ার নির্দেশ: পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে হড়পা বানের প্রবল চাপ সামলাতে ভারত-ভুটান যৌথ উদ্যোগে তৈরি পুনাসাংচু-২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাঁধের পরিকাঠামো বাঁচাতে উজান থেকে আসা জল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে প্রশাসন, যা সরাসরি সঙ্কোশ নদীর জলস্তরকে এক ধাক্কায় বিপদসীমার উপরে তুলে দিচ্ছে।
-
সীমান্তে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা: ভুটান সরকারের তরফে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর জানা গিয়েছে, ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে বানের জল ভারত-ভুটান সীমান্ত ছুঁয়ে নিম্নাঞ্চলে তাণ্ডব চালাতে পারে।
অর্ণব-পরবর্তী নিম্নচাপের বৃষ্টিতে দ্বিগুণেরও বেশি বিপদ
কেবল উজান থেকে নেমে আসা জলচ্ছ্বাসই নয়, উত্তরবঙ্গের শিয়রে জোড়া বিপদ ডেকে এনেছে আবহাওয়া। ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর পরবর্তী নিম্নচাপের প্রভাবে দক্ষিণ ভুটান ও আলিপুরদুয়ার সহ সংলগ্ন উত্তরবঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক জল ধারণ ক্ষমতা কমে গিয়ে প্লাবন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্পূর্ণ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ উত্তরবঙ্গের শিয়রে শমন! ভুটানের হিমবাহ লেক ফেটে ধেয়ে আসছে জল
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সতর্কতা ও হাই অ্যালার্ট
ভারত সরকারের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন (CWC) প্রতি মুহূর্তে সঙ্কোশ ও অন্যান্য সংলগ্ন নদীর জলস্তরের ওপর নজর রাখছে।
-
বনমন্ত্রীর ভিডিও বার্তার পর মাইকিং: পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর রাতেই আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম ও নদী সংলগ্ন এলাকার অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে সতর্কতামূলক ভিডিও বার্তা দিয়েছেন বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও।
-
এনডিআরএফ ও এসডিআরএফ মোতায়েন: কোচবিহারের তুফানগঞ্জ, বক্সিরহাট এবং আলিপুরদুয়ারের স্পর্শকাতর গ্রামগুলিতে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF)-র বিশেষ টিম স্পিডবোট ও উদ্ধারকারী সামগ্রী নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে।
-
ত্রাণ শিবিরের প্রস্তুতি: বক্সিরহাটের রামপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েত সহ নদী তীরবর্তী একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে নিরাপদ স্থানে এবং সরকারি আশ্রয় শিবিরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করেছে ব্লক প্রশাসন।
হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে একের পর এক হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার এই প্রাকৃতিক ঘটনা পরিবেশবিদদের চিন্তায় ফেলেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দুশ্চিন্তার হতে চলেছে।


