বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষক:
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার আজ পূর্ণ করল ৬ মাস। রাজনৈতিক জমানার পরিবর্তনের সাথে সাথেই প্রশাসনের অন্দরে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা গেলেও, অর্ধবছরের মাথায় দাঁড়িয়ে শাসকদলের জন্য পরিস্থিতি কেবল উদযাপনের নয়, বরং একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও জাতীয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঠিন রাজনৈতিক জবাবদিহিরও।
নবান্নে প্রশাসনিক গতি ফিরিয়ে আনার প্রয়াস থেকে শুরু করে রাজ্য রাজনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা ইস্যুতে গত ৬ মাসে শুভেন্দু সরকারের ঝুলিতে যেমন এসেছে কয়েকটি বড় চমক, তেমনই বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণে তৈরি হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক অস্বস্তি।
আরও পড়ুনঃ আজ ‘নিয়মরক্ষা’র ভোটের ফল; ৬ মাসে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ল না কমল
১. প্রায় ৬ মাসের প্রশাসনিক সাফল্য ও খতিয়ান (Report Card)
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক মনোযোগ ছিল পরিকাঠামো পুনর্গঠন এবং পূর্ববর্তী সরকারের বেশ কিছু নীতির পর্যালোচনার দিকে।
-
মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন বাতিল ও ডব্লিউবিএসএসসি-তে বিলয়: সম্প্রতি রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিতর্কিত ‘মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন’ (MSC) বাতিল করে তা সরাসরি ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন’ (WBSSC)-এর সাথে যুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা ও শিক্ষকদের জন্য এক ছাতার তলায় শূন্যপদ পূরণ করা।
-
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বকেয়া আর্থিক সাহায্য: সাম্প্রতিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মালদহ সহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ অনুমোদন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত গৃহের পুনর্বাসনে ১.৮০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সবুজ সংকেত দিয়েছে রাজ্য সরকার।
-
ম্যাচিউরড এফআইআর (FIR) ও আইনি ছাড়পত্র: পুলিশের মাধ্যমে এফআইআর নেওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কঠোরভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজেপি জমানার দাবি, এর ফলে বহু পুরনো হিংসা ও চাপা পড়ে থাকা অপরাধ নথিভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
২. শাসকদলের সামনে প্রধান ৫টি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
৬ মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই বিজেপি সরকারের সামনে একাধিক আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে:
┌─────────────────────────────────────────┐
│ শুভেন্দু সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ │
└────────────────────┬────────────────────┘
│
┌──────────────────┬──────────────┴───────┬──────────────────┐
▼ ▼ ▼ ▼
[আইনশৃঙ্খলা ও SCRB] [ভোটার তালিকা-SIR] [অভিযোগ ও এফআইআর] [প্রশাসনিক সমন্বয়]
তথ্য ফাঁসের চাপ কমিশন বিতর্ক আইনজীবী মহলে শঙ্কা বিরোধী শূন্যতা
ক) এসসিআরবি (SCRB) রিপোর্টের অস্বস্তি ও বিরোধীদের তোপ
রাজ্য অপরাধ নথি ব্যুরোর (SCRB) আরটিআই রিপোর্ট সামনে আসতেই চরম চাপে রাজ্য প্রশাসন। মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২,৪৫৪টি ধর্ষণ ও ৬০০টি খুনের নথিভুক্তিকরণের তথ্য সামনে এনে তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস সরকারের ‘নারী নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিজেপি একে পুরনো জমানার কেস রি-ওপেনিং বলে যুক্তি দিলেও রাজপথে বিরোধীদের আক্রমণ থামাতে তা যথেষ্ট হয়নি।
খ) সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে কেন্দ্র করে দেশজোড়া গণআন্দোলন
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ज्ञानেশ কুমারের এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগে দিল্লি, পাটনা, বেঙ্গালুরু থেকে শুরু করে শিলিগুড়ি পর্যন্ত চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। রাজ্যজুড়ে ডিওয়াইএফআই, কংগ্রেস ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির তীব্র আন্দোলন নতুন সরকারকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কোনঠাসা করে তুলেছে।
গ) আইনি কাঠামোর ওপর আক্রমণ ও আদালত বিতর্ক
সিপিআই(এম) নেতা তথা প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের বাসভবনে ভোরের দুষ্কৃতী হামলাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে আইনজীবী সমাজ ফুঁসে উঠেছে। কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে আইনি ব্যবস্থার সুরক্ষায় পুলিশের ভূমিকা স্পষ্ট করতে। অন্যদিকে, তৃণমূল সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর কেন্দ্র ও সংবাদমাধ্যমের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বিরোধী জলঘোলা মামলাও প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধি করেছে।
ঘ) নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের অ্যাসিড টেস্ট
ক্ষমতায় আসার পর রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম—এই দুই মর্যাদাপূর্ণ আসনে উপনির্বাচনের গণনাই বলে দেবে শুভেন্দু অধিকারীর ৬ মাসের সরকারের ওপর মানুষ কতটা আস্থা রেখেছেন। নন্দীগ্রামে বিরোধীদের ব্যাপক ভোটলুটের অভিযোগ ও রেজিনগরে হুমায়ুন কবীরের পুলিশি হেনস্থার প্রতিবাদ রাজনৈতিক বিতর্ককে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ মহানন্দার ঘাট থেকে হিলকার্ট রোড; DYFI-এর মিছিলে উত্তাল শিলিগুড়ির রাজপথ
সারসংক্ষেপ: আগামীর পথ চলা
ছয় মাসের মাথায় দাঁড়িয়ে শুভেন্দু সরকারের সামনে মূল কাজ দুটি—একদিকে পূর্ব প্রতিশ্রুতি মেনে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাজ্যের শান্তিশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার ইস্যুতে বিরোধীদের ক্রমাগত আক্রমণের রাজনৈতিক মোকাবিলা করা। বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং ভোটার তালিকা বিতর্ক আগামী দিনগুলিতে বিজেপি সরকারের জন্য আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।


