২০২৬ সালের মে মাস। বাংলার তপ্ত রোদে কেবল প্রকৃতি নয়, ফুটছে রাজ্য রাজনীতিও। ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পর থেকে কলকাতার আকাশ-বাতাস এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের সাক্ষী। একদিকে রাজভবন, অন্যদিকে নবান্ন—এই দুই ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সংকট। নির্বাচনী ফলাফল বলছে, ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০৭টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেস থমকে গিয়েছে মাত্র ৮০টি আসনে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর কেন্দ্রে তাঁর একসময়ের সহযোদ্ধা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু এই সংখ্যাতত্ত্বের উর্ধ্বে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রশ্ন: গণতান্ত্রিকভাবে পরাজিত হওয়ার পর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হওয়া উচিত?
আরও পড়ুনঃ নবান্ন নয়, রাইটার্স থেকেই চলবে সরকার, ইঙ্গিত শমীকের
সংবিধানের কারিগররা জানতেন যে, ক্ষমতার মোহ মানুষের সহজাত। তাই তাঁরা সংবিধানে এমন কিছু রক্ষাকবচ রেখে গেছেন যা ব্যক্তি-ইচ্ছার ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে। এই মুহূর্তে বাংলার রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের সংবিধানের ১৬৪ নম্বর অনুচ্ছেদ। সাংবাদিকতার তথ্যনিষ্ঠ ভাষায় বলতে গেলে, এই অনুচ্ছেদটিই নির্ধারণ করে একজন মুখ্যমন্ত্রী কতক্ষণ তাঁর পদে আসীন থাকবেন। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা রাজ্যপালের ‘সন্তোষ’ বা ‘Pleasure’ অনুযায়ী পদে বহাল থাকেন। এখানে ‘সন্তোষ’ শব্দটির অর্থ মোটেও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নয়। এটি সরাসরি যুক্ত বিধানসভায় সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর। যেহেতু ৪ মে’র ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, তাই নৈতিক ও সাংবিধানিক উভয় দিক থেকেই বর্তমান সরকারের কার্যকাল শেষ হয়ে গিয়েছে।
তবে এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা রয়েছে, যা নির্ধারিত হয়েছে সংবিধানের ১৭২ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর ১৭তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম অধিবেশন বসেছিল এবং সেই অনুযায়ী এই বিধানসভার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে ২০২৬ তারিখে। অর্থাৎ, হাতে রয়েছে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। আইন অনুযায়ী, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বর্তমান মন্ত্রিসভার সমস্ত ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদি এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী নিজে থেকে পদত্যাগ না করেন, তবে রাজভবনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বরখাস্তের চিঠি পাঠানো একটি প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়াবে।
গণতন্ত্রের ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, পরাজয় মেনে নেওয়াটাই একজন জননেতার প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু বর্তমানে নবান্ন থেকে যে ধরনের সুর শোনা যাচ্ছে, তাতে তৈরি হয়েছে সংঘাতের পরিবেশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন এবং পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভিভিপ্যাট (VVPAT) এবং ইভিএম (EVM) গণনার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি। এই পরিস্থিতিতে হারানো ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা কেবল প্রশাসনিক স্থবিরতাই তৈরি করছে না, বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে। যদি ৭ মে’র পর পরিস্থিতি একই থাকে, তবে সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
রাজ্যপাল তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নবনির্বাচিত বৃহত্তম দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। যদি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে গিয়ে ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁকে এবং তাঁর মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে রাজভবন থেকেই নতুন গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা হতে পারে। এরপরও যদি সরকারি ভবন বা পদ ছাড়তে কোনো বাধা সৃষ্টি করা হয়, তবে তাকে ‘সাংবিধানিক কাঠামোর ভাঙন’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থে কেন্দ্রীয় বাহিনীর (যেমন সিআরপিএফ) সহায়তা নেওয়া এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের আইনি সংস্থানও রয়েছে। যদিও ভারতের মতো পরিণত গণতন্ত্রে এমন দৃশ্য কাম্য নয়, তবুও আইনের শাসন কায়েম রাখতে এটিই শেষ পথ হতে পারে।
অনেকে মনে করছেন, এই অচলাবস্থা কাটাতে হয়তো রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি শাসনের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, জনগণের রায় স্পষ্ট। বিজেপির হাতে প্রয়োজনীয় ২০৭টি আসন রয়েছে, যা সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক ফিগার ১৪৮-এর থেকে অনেক বেশি। তাই নতুন নির্বাচন বা রাষ্ট্রপতি শাসনের বদলে কেবল শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরই এখন একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।
আরও পড়ুনঃ ‘আমি ইস্তফা দেব না’ সাফ জানিয়ে দিলেন মমতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তিনি কি একজন লড়াকু নেত্রী হিসেবে জনমতকে সম্মান জানিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে বিদায় নেবেন, নাকি জেদ ধরে রাজপথে আন্দোলনের পথে হাঁটবেন? যদি তিনি আন্দোলনের পথ বেছে নেন, তবে তা হয়তো তাঁর দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় আইনের উর্ধ্বে কেউ নন।
সংবিধানের ১৭২ ও ১৬৪ অনুচ্ছেদের মিলিত প্রভাব এটাই বলছে যে, ৭ মে’র পর বাংলার মসনদে নতুন কেউ বসবেন। রাজভবন থেকে পাঠানো একটি চিঠিই হতে পারে এই দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি। শেষ পর্যন্ত কি আমরা এমন এক পরিস্থিতি দেখব যেখানে একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সরিয়ে দিচ্ছে? নাকি শুভবুদ্ধির উদয় হয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ বিদায় মঞ্চ তৈরি হবে? বাংলার মানুষ এখন শান্তিতে ক্ষমতার পালাবদল দেখতে চায়। গণতন্ত্রের উৎসব তখনই সার্থক হয়, যখন পরাজিত পক্ষ জয়ী পক্ষকে পথ ছেড়ে দেয় এবং জয়ী পক্ষ জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করে।
৭ মে ২০২৬—এই তারিখটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর হয়ে থাকবে।


