১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় মার্কিন পরমাণু বোমার নারকীয় ধ্বংসলীলার ৮০ বছর পার হয়ে গেলেও, সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের প্রভাব ও বিজ্ঞানসম্মত ফলাফল নিয়ে গবেষণা আজও অব্যাহত। সম্প্রতি ইতালি ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি গবেষক দল হিরোশিমার সমুদ্রসৈকতের ভগ্নস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি অবিশ্বাস্য সংকর ধাতুর সন্ধান পেয়েছেন, যা গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব বলেই দাবি করা হচ্ছে।
ইতালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুকা বিন্ডি এবং তাঁর গবেষক দলের এই চমকপ্রদ গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ (Science Advances)-এ প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ২ বছর পূর্ণ, ফিরে আসছে সেই ৫ অগস্ট! জনসমক্ষে আসতে চলেছেন মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা
‘লিটল বয়’ বিস্ফোরণ ও নয়া পদার্থের গঠন প্রক্রিয়া
১৯৪৫ সালের ৬ অগস্ট হিরোশিমায় ফেলা ‘লিটল বয়’ নামক পরমাণু বোমাটি প্রায় ২০ হাজার টন টিএনটি (TNT)-র সমান ধ্বংসক্ষমতা সৃষ্টি করেছিল।
-
অকল্পনীয় তাপমাত্রা: বিস্ফোরণের মুহূর্তে তাপমাত্রার পারদ পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইটে (প্রায় ৬,৬৪৮.৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।
-
ধাতব বাষ্প থেকে দ্রুত জমাট: এই তীব্র উত্তাপে সেখানকার মাটি, কাচ, বাড়িঘরের লোহার কাঠামো ও বিভিন্ন ধাতু মুহূর্তের মধ্যে বাষ্পীভূত (Vaporized) হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক তার পরমুহূর্তেই সংগৃহীত ওই ধাতব বাষ্প অত্যন্ত দ্রুত শীতল হয়ে জমে যায়।
-
অদ্ভুত পারমাণবিক বিন্যাস: সাধারণত কোনো ধাতু তরল বা বাষ্প থেকে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হওয়ার সময় তার পরমাণুগুলি একটি নির্দিষ্ট ও চেনা স্ফটিক কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু হিরোশিমার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার কারণে পরমাণুগুলি তাদের স্বাভাবিক বিন্যাসে ফেরার কোনো সুযোগই পায়নি। ফলে এক নজিরবিহীন ও অদ্ভুত পারমাণবিক কাঠামোয় আবদ্ধ হয়ে যায় সেগুলি।
আরও পড়ুনঃ কাকভোরে ভূমধ্যসাগরে জোরালো ভূমিকম্প: মিশরসহ লেবানন ও সিরিয়ায় আতঙ্ক, কম্পন সুয়েজ খাল এলাকাতেও
কী মিলেছে গবেষণায়?
বিজ্ঞানীরা হিরোশিমা বে (Bay) এলাকার সৈকত থেকে ৩৪টি বিভিন্ন বস্তুর নমুনা সংগ্রহ করে এক্স-রে (X-Ray) এবং হাই-পাওয়ার মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে পরীক্ষা করেন।
-
উপাদান: বেশিরভাগ নমুনায় আয়রন ও ক্রোমিয়ামের সাধারণ সংকর থাকলেও একটি নমুনায় পাওয়া গেছে—আয়রন (লোহা), ক্রোমিয়াম, নিকেল, মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ, সিলিকন এবং অ্যালুমিনিয়ামের এক বিস্ময়কর ও অদ্ভুত মিশ্রণ।
-
ব্যতিক্রম: ১৯৪৫ সালে আমেরিকার নিউ মেক্সিকোয় পরিচালিত ‘ট্রিনিটি’ (Trinity) পারমাণবিক পরীক্ষার পর কাচের মতো ‘ট্রিনিটাইট’ তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে ‘কোয়াসিক্রিস্টাল’ (Quasicrystal)-এর উপস্থিতি মেলে। কিন্তু হিরোশিমার এই নতুন সংকর ধাতুটিতে কোনো কোয়াসিক্রিস্টাল নেই, এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের।
বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল ধূমকেতুর তীব্র প্রভাব বা হঠাৎ বজ্রপাতের মতো কোনো প্রাকৃতিক চরমতম অবস্থাতেই এই ধরণের ধাতব বিন্যাস তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে প্রভাব
এই আবিষ্কার থেকে প্রমাণিত হয় যে অত্যন্ত চরম প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নতুন প্রকৃতির উপাদান তৈরি হওয়া সম্ভব। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, হিরোশিমার ভগ্নস্তূপ থেকে পাওয়া এই সংকর ধাতুর পারমাণবিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে মহাকাশযান, মিসাইল বা ভারী শিল্পের ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত উচ্চ-তাপ প্রতিরোধী (Heat-resistant) মেটেরিয়াল বা সংকর বস্তু তৈরির নতুন কৌশল উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।


