বিশেষ জাতীয় প্রতিনিধি:
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের নজিরবিহীন ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় সাড়ে ১৩ কোটি ভোটারকে বাদ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে মঙ্গলবার রণক্ষেত্রে পরিণত হলো রাজধানী দিল্লি। নীতি আয়োগের বাইরে সাঁড়াশি ব্যারিকেডে আটকে দেওয়ার পর সংসদ ভবনের অদূরে আকাশবাণী ভবনের সামনে একটানা সাড়ে ৮ ঘণ্টা রাজপথে ধর্না-বিক্ষোভ চালান লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অখিলেশ যাদবসহ ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের প্রায় ৩০০ জন সাংসদ।
রাত ৮টা নাগাদ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা সহ প্রায় ১০০ জন বিরোধী সাংসদকে চড়াও হয়ে আটক করে দিল্লি পুলিশ। উত্তর দিল্লির কিংসওয়ে ক্যাম্প থানায় নিয়ে যাওয়ার পর রাত পৌনে ১০টা নাগাদ তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। রাজপথের এই নজিরবিহীন সংগ্রামের পাশাপাশি এবার সরাসরি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও অপসারণের দরবার করতে ৭ থেকে ৯ অক্টোবরের মধ্যে সাক্ষাতের সময় চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অখিলেশ যাদবরা।
আরও পড়ুনঃ মহালয়ায় ইডেনে থাকছেন না মোদী-শাহ; ছাঁটা হচ্ছে জমকালো সরকারি অনুষ্ঠান
সুপ্রিম কোর্টের নোটিস ও ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে চাপে কমিশন
ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে ফাঁস হয়ে যায় যে, নির্বাচন কমিশনের বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের কড়া আপত্তি ও দ্বিমতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একক সিদ্ধান্তে বিতর্কিত এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া চাড়িয়েছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
এরই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ডিভিশন বেঞ্চ কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস পাঠিয়ে ১ সপ্তাহের মধ্যে জবাব তলব করেছে। প্রধান বিচারপতি সাফ জানান—ফর্ম-৬ পরিবর্তনের কোনো অনুমতি শীর্ষ আদালত দেয়নি। সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া তোপ ও নথিপত্র ফাঁসের পরেই সিইসি-র ইস্তফার দাবিতে অল-আউট লড়াইয়ে নেমেছে বিরোধীরা।
অভিষেক-খড়্গে-অখিলেশের ত্রিমুখী তোপ: “পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লক্ষ নাম গায়েব!”
ধর্নামঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনারের আঁতাত নিয়ে সুর চড়ান বিরোধী শীর্ষ নেতৃত্ব:
-
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: “পশ্চিমবঙ্গে স্রেফ একতরফাভাবে ৯০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে লক্ষ লক্ষ আবেদন ঝুলে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ধরা পড়া চুরি ঢাকা দেওয়া যাবে না, জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।”
-
মল্লিকার্জুন খড়্গে: “স্বাধীনতার পর প্রাপ্ত সর্বজনীন ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে মোদী-শাহের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করছেন সিইসি। দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে দেব না।”
-
অখিলেশ যাদব: “২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। আর এবার পশ্চিমবঙ্গে তো কমিশন নির্লজ্জতার সব সীমা পার করে দিয়েছে।”
আরও পড়ুনঃ পাহাড় থেকে নেমে আসছে ধস ও কাদার স্রোত, মানাংয়ের চামে গ্রামে ভয়াবহ বন্যা ও বিপর্যয়! অবরুদ্ধ উত্তর নেপাল
কমিশনের ‘প্রোটোকল’ বাহানা ও রাহুলের পাল্টা তোপ
সাংসদদের ওপর পুলিশি তাণ্ডব ও সিইসি-র দেখা না করা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের দাবি, ৩ শত সাংসদকে সংসদের অ্যানেক্স ভবনে নিয়ে গিয়ে বৈঠক করার প্রস্তাব বৈধানিক প্রোটোকল বহির্ভূত, তাই কোনো পদস্থ আধিকারিককে স্মারকলিপি নিতে পাঠানো যেতে পারে।
কমিশনের এই সাফাই উ উড়িয়ে দিয়ে আকাশবাণী ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধী তীব্র আক্রমণ শানান:
“আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাচিত প্রতিনিধি। জ্ঞানেশ কুমার ৩০০ জন জনপ্রতিনিধিকে মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন! অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী ও জ্ঞানেশ কুমার দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছেন।”
বুধবারে ফের ‘নির্বাচন সদন’ অভিযান ও দেশব্যাপী গণআন্দোলন
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন প্রত্যাহার করছে না বিরোধীরা। বুধবার পুনরায় নির্বাচন সদন ঘেরাও এবং দিল্লির পাশাপাশি কলকাতা, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুতেও জেলাভিত্তিক গণ-অবস্থান ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। সুপ্রিম কোর্টের চাপ এবং বিরোধী জোটের এই ঐতিহাসিক রাজপথ দখলের জেরে দিল্লির রাজনৈতিক পারদ এখন চরম তুঙ্গে।


