বিশেষ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সংবাদ প্রতিবেদন:
দীপাবলি ও কালীপুজোর আবহেই উঠে এলো বঙ্গ সংস্কৃতির হৃদপিণ্ড কলকাতার নামকরণ ও তার প্রাচীনত্বের এক অনন্য ঐতিহাসিক অধ্যায়। সাধারণ লোকমুখে কলকাতাকে ‘কালীক্ষেত্র’ বলা হলেও, সাম্প্রতিক নথিবদ্ধ তথ্য ও পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা নিশ্চিত করছে যে, আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলটি দেবী কালীর নামেই সুপরিচিত। সরস্বতী ও আদিগঙ্গার বুক বেয়ে চলা প্রাচীন বাণিজ্যপথ থেকে শুরু করে মুঘল আমল হয়ে আধুনিক সময়—কলকাতার শেকড় প্রোথিত রয়েছে দেবী কালীর আরাধনা ও স্মৃতির গভীরে।

১. টলেমির বিবরণ ও প্রাচীন ‘কলিগ্রামাম’
-
বণিকদের বাণিজ্যপথ: প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে আদিগঙ্গা ও সরস্বতী নদীকে কেন্দ্র করে বঙ্গীয় সদাগর ও বণিকেরা সিংহল (শ্রীলঙ্কা), যবদ্বীপ, মালদ্বীপ, সুবর্ণদ্বীপ (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) এবং দূর প্রাচ্যের ক্রীট, গ্রীস, রোম ও মিশরে বাণিজ্য করতে যেতেন।

-
গ্রীক ঐতিহাসিকের সাক্ষ্য: সেই প্রাচীন সময়েই এই শহরতলির জনপদটির নাম আন্তর্জাতিক ভূগোলে নথিভুক্ত হয়েছিল। গ্রীক দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ টলেমি (Ptolemy)-র বিবরণীতে এই অঞ্চলের নাম উল্লেখ রয়েছে ‘কলিগ্রামাম’ (Colygrammam) হিসেবে, যার সুনির্দিষ্ট বাংলা অনুবাদ হলো ‘কালীগ্রাম’। এই উল্লেখ প্রমাণ করে যে, দুই সহস্রাব্দ আগেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই জনপদের পরিচয় গড়ে উঠেছিল দেবীর নামে।
২. কালীঘাটের মূর্তি ও সেনযুগের স্থাপত্যশৈলী
-
প্রাচীন শিল্পরীতি: কালীঘাটের বর্তমান মায়ের মূর্তিটি অত্যন্ত প্রাচীন ভাস্কর্যশিল্পের স্মারক। সেকালের ঐতিহ্য মেনে মূর্তির হাত পূর্ণাঙ্গ না হয়ে কাঁধ থেকে দুই দিকে সামান্য প্রসারিত, মুখমণ্ডল সুগোল, সুবিশাল দুটি নয়ন এবং মূর্তির কলেবর কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত।
-
বল্লাল সেন ও কালীযন্ত্র: সেন রাজবংশের সঙ্গে কালীঘাটের নবনির্মাণ ও শক্তি উপাসনার গভীর সম্পর্ক ছিল। সেনরাজ বল্লাল সেনের নাম কালীঘাটের মন্দিরের পুনর্গঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এমনকি নবদ্বীপের ঐতিহাসিক ‘বল্লাল ঢিবি’টি শ্রীযন্ত্র বা কালীযন্ত্রের নকশায় নির্মিত হয়েছিল, যা সেনযুগে এই অঞ্চলে শক্তিপীঠের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
আরও পড়ুনঃ পুরোহিত এনে কালীপূজা করালে দেবী কুপিতা হন! গুপ্তসাধন তন্ত্রে তেমনই বলা হচ্ছে
৩. ‘কালীকোটা’ থেকে ‘কলকাতা’
-
আইন-ই-আকবরীর উল্লেখ: মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কালে আবুল ফজলের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরী’-তেও এই কালীক্ষেত্রের উল্লেখ মেলে। সে যুগে এই রাজস্ব পরগনাটি ‘কালীকোটা’ নামে নথিভুক্ত ছিল।

-
নামকরণের বিবর্তন: গবেষকদের মতে, টলেমির ‘কলিগ্রামাম’ (কালীগ্রাম) এবং মুঘল আমলের ‘কালীকোটা’ থেকেই কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক ‘কলকাতা’ (Calcutta) নামের উৎপত্তি ঘটেছে।
ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক এই সমস্ত তথ্য প্রমাণ করে যে, কলকাতা নিছক ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের তৈরি ৩০০ বছরের শহর নয়; বরং এটি দুই হাজার বছরেরও প্রাচীন এক ঐতিহ্যবাহী সনাতন সংস্কৃতি ও শক্তিপীঠের পবিত্র কেন্দ্রস্থল।


