বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে ‘ভূত’ একটি চিরন্তন ও জনপ্রিয় বিষয় হলেও, ‘পেত্নী’ বা নারী-প্রেতাত্মার ধারণাটি সবসময়ই এক স্বতন্ত্র ও মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা বহন করে এসেছে। আধুনিক হরর কথাসাহিত্য থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘পেত্নি সমগ্র’ এবং প্রাবন্ধিকের মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তোলা পেত্নীচর্চার সামগ্রিক চিত্রটি এক গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পঠনপাঠনের সুযোগ করে দেয়।
১. প্রেতিনীর আখ্যান: পিতৃতন্ত্র ও অবদমনের দর্পণ
প্রাবন্ধিকের আলোচনা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রজন্মের হরর ও থ্রিলার লেখক অভিষেক চট্টোপাধ্যায় (যাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে ‘তেরো নম্বর ফ্লোর’, ‘মৃত জ্যোৎস্নার রাত্রি’ এবং ‘একটি মৃত্যুর গান’) তাঁর গল্পে পেত্নীদের যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্ট সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:
-
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বঞ্চনা: পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের পলে পলে অত্যাচারিত হওয়া এবং আজীবন কারও না কারও ‘অধীন’ বা পরাধীন হয়ে থাকার বেদনা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবদমনের জন্ম দেয়। এই অবদমনই মৃত্যুর পরেও বিদেহী জীবনে হাহাকার ও জিঘাংসার রূপ নেয়।
-
ধারণাগত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিশোধ: লোককথায় বা চলচ্চিত্রে (যেমন সত্যজিতের ছবিতে) সাধারণত সবজান্তা ভূতের ধারণা দেখা গেলেও, অভিষেকের উপন্যাসে প্রেতিনীরা সর্বজ্ঞ নয়। মৃত্যুর মুহূর্তটিতে তারা যা ভেবেছিল বা যে বঞ্চনার শিকার হয়েছিল, সেই সীমাবদ্ধ ধারণাকে সঙ্গী করেই তারা বিদেহী জগতে ঘোরে। অপমৃত্যুর জন্য কে দায়ী তা জানতে পেরে তাদের উদ্দাম প্রতিশোধস্পৃহা ছোটগল্পের গণ্ডি পেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের আকার নেয়।
২. ‘পেত্নি সমগ্র’ ও প্রকাশের অভিনব বিপণন কৌশল
বাংলা বইবাজারে পুরুষ ভূতের আধিপত্যের ভিড়ে ‘পেত্নি সমগ্র’ (সঙ্কলক অমিতাভ চক্রবর্তী, প্রকাশক শান্তনু ঘোষ) এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। মহিলা ভূতের গল্পের অপ্রতুলতার মাঝেই এই বইটিকে পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রকাশক অভিনব কিছু বিপণন কৌশল গ্রহণ করেছিলেন:
-
সৌন্দর্যের সঙ্গে ভয়ের সহাবস্থান: বইমেলায় সুন্দরীদের হাতে ‘পেত্নির বিকটদর্শন বই’ দিয়ে ছবি তুলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার আইডিয়াটি দারুণ সাড়া ফেলেছিল। পাঠকদের স্বতঃস্ফূর্ত ভিড় প্রমাণ করেছিল যে ভয়ের উপাদানের সঙ্গে নান্দনিকতার মেলবন্ধন বেশ ভালোই কাজ করে।
-
ছৌ নাচ ও ‘রোগা-মোটা ভূত’ লীলা: দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের সময় পুরুলিয়ার ছৌ নাচের শিল্পীকে মুখোশ পরে প্রচারের কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রকাশকের নিজের তাতে অংশ নেওয়া—সব মিলিয়ে বইমেলায় ভৌতিক রসবেত্তাদের মধ্যে এক দারুণ উন্মাদনা তৈরি করেছিল।
আরও পড়ুনঃ পুরোহিত এনে কালীপূজা করালে দেবী কুপিতা হন! গুপ্তসাধন তন্ত্রে তেমনই বলা হচ্ছে
৩. লোককথা থেকে আধুনিক নাগরিক আতঙ্ক
বাঙলার আবহমান কাল ধরে চলে আসা শ্যাওড়াগাছের মগডাল, মাছের গন্ধকাতুরে মেছোভূত কিংবা নিশির ডাকের পাশাপাশি আধুনিক শহুরে জীবনের বহুতল বা নির্জন লিফ্টের যুগেও অতিপ্রাকৃতের আতঙ্ক অন্য মাত্রা নিয়েছে। রাতের শিফট শেষে আপিস ফেরত মানুষের জীবনে ‘তেরো নম্বর ফ্লোর’-এর রহস্য বা পেত্নীচর্চার এই ধারা প্রমাণ করে যে, ভয় এবং সমাজবাস্তবতা হাত ধরাধরি করেই চলে।
সব মিলিয়ে, পেত্নী বা প্রেতিনীদের এই আখ্যান নিছক নিছক বিনোদন বা গা ছমছমে গল্প নয়; বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে নারীর দীর্ঘশ্বাসের পরাবাস্তব ও হিংস্র বহিঃপ্রকাশ।


