দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঐতিহ্যবাহী নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে দ্বাদশ শ্রেণীর এক ছাত্রের রহস্যমৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল। গত মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে গরম চা পানের পরই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে দীপ্তাংশু মাহাতো নামে ওই ছাত্রটি। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার জেরে বুধবারই পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন মিশনের প্রধান শিক্ষক স্বামী ইষ্টেষানন্দ। পাশাপাশি, ছাত্রদের মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগে সৌরভ তরু বিশ্বাস, সোমনাথ বৈরাগী এবং সমরেশ ধাড়া নামে তিন হোস্টেল কর্মীকে তৎক্ষণাৎ সাসপেন্ড করেছে মিশন কর্তৃপক্ষ। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন ক্ষুব্ধ ছাত্র ও অভিভাবকেরা।
মৃত ছাত্রের বাবা, কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী মনোরঞ্জন মাহাতো নরেন্দ্রপুর থানায় স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চরম গাফিলতির লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণেই তিনি তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন। মনোরঞ্জনবাবু জানান, মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিট নাগাদ তিনি যখন আদালতে ছিলেন, তখন স্কুল থেকে ফোন করে জানানো হয় তাঁর ছেলে অসুস্থ। দুপুর ১টা নাগাদ তিনি স্কুলে পৌঁছে দেখেন, দীপ্তাংশুর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, সে ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না এবং অনবরত কাশছে। জানা গেছে, সকাল পৌনে দশটা থেকে দশটার মধ্যে ফ্লাস্ক থেকে প্রচণ্ড গরম চা খেয়ে ফেলেছিল দীপ্তাংশু।

অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ ছাত্রটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে না গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁর আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমনকি স্কুলের চিকিৎসক দীপ্তাংশুকে জরুরি ভিত্তিতে বড় হাসপাতালে রেফার না করে কেন পরবর্তীতে এন্ডোস্কোপি করার পরামর্শ দিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মৃত ছাত্রের বাবা।
আরও পড়ুনঃ জ্বালানি সংকটে রাশিয়া; বন্ধুর ‘দুর্দিনে’ এ বার পাশে দাঁড়াল ভারত
দীপ্তাংশুর পরিপাকতন্ত্রে গুরুতর ক্ষত তৈরি হওয়ায় সে তীব্র অক্সিজেনহীনতায় ভুগছিল। মনোরঞ্জনবাবু দীপ্তাংশুকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে প্রথমে একটি স্থানীয় হাসপাতালে যান, কিন্তু সেখানে তাকে ভর্তি নিতে অস্বীকার করা হয়। এরপর সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা দীপ্তাংশুকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বাবার প্রশ্ন, চা প্রচণ্ড গরম বুঝতে পেরেও ছেলে তা মুখে রাখল কেন? দীপ্তাংশু তাকে জানিয়েছিল, মেঝের নোংরা হওয়ার ভয়ে সে তা ফেলে দিতে পারেনি। ঘটনার সময় হাউস মাস্টার কোথায় ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শোকস্তব্ধ বাবা।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, হাউস মাস্টার, পিজি এবং হোস্টেল কর্মীদের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একগুচ্ছ বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন ছাত্র ও অভিভাবকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই হোস্টেলের ছাত্রদের উপর অমানুষিক চাপ সৃষ্টি করা হতো। এমনকি এক হোস্টেল কর্মীর বিরুদ্ধে প্রতি শুক্রবার মদ্যপ অবস্থায় ছাত্রদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক স্বামী শাস্ত্রজ্ঞানন্দ মহারাজের উপস্থিতিতে ছাত্র ও অভিভাবকদের নিয়ে একটি বৈঠক হলেও, কর্তৃপক্ষের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেননি আন্দোলনকারীরা।
বর্তমানে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে এনআরএস হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন দীপ্তাংশুর সহপাঠীরা। ঘটনার জেরে গভীর উদ্বেগ ও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শিক্ষা মহল, অভিভাবক এবং প্রাক্তনীদের মধ্যে। ইতিমধ্যেই পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে।


