কিউবার আকাশে এখন কেবল নিকষ অন্ধকার। ক্যারেবিয়ান এই দ্বীপরাষ্ট্রটি বর্তমানে এমন এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম। মে ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে এসে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী ভিসেন্টে দে লা ও লেভি এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, কিউবার ভাণ্ডারে এখন ডিজেল এবং ফুয়েল অয়েলের পরিমাণ শূন্য। রাজধানী হাভানা থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রাম—সর্বত্রই এখন হাহাকার। তোমার চোখের সামনে যদি এমন দৃশ্য ফুটে ওঠে যেখানে দিনে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, তবে বুঝবে সেটি আজকের কিউবা।
আরও পড়ুনঃ আশঙ্কাই হল সত্যি, আরও দাম বাড়ল পেট্রল-ডিজেলের
এই চরম বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণ। কিউবা সাধারণত তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ ভেনেজুয়েলা এবং মেক্সিকো থেকে আমদানির মাধ্যমে মেটাত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকির ফলে সেই সরবরাহের পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। মার্চ মাসে রাশিয়ার একটি তেলবাহী জাহাজ ‘আনাতোলি কোলোডকিন’ কিউবার বন্দরে ভিড়ে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই জ্বালানি ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বর্তমানে কেবল স্থানীয় গ্যাসকূপ থেকে সংগৃহীত সামান্য গ্যাস দিয়ে কোনোমতে কিছু এলাকা সচল রাখা হচ্ছে, যা চাহিদার ভগ্নাংশ মাত্র।
রাজধানী হাভানার দিকে তাকালে তুমি দেখতে পাবে এক অচল শহর। দীর্ঘস্থায়ী ব্ল্যাকআউটের ফলে হাসপাতালগুলোতে অপারেশন থিয়েটার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় আবর্জনা পরিষ্কারের ট্রাকগুলোও রাস্তায় নামছে না, ফলে হাভানার অলিগলিতে এখন ময়লার স্তূপ। গত বুধবার অর্থাৎ ১৩ মে রাতে এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সান মিগুয়েল দেল পাদ্রনসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। আবর্জনা পুড়িয়ে রাস্তা অবরোধ করে তারা স্লোগান দিতে থাকেন— “আমাদের আলো দাও!” এই বিক্ষোভ কেবল বিদ্যুতের জন্য নয়, বরং এই অন্ধকার যে খাদ্য সংকট আর অর্থনৈতিক স্থবিরতা ডেকে এনেছে, তার বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত চিৎকার। জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই সংকটের পর থেকে এটিই ছিল হাভানার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক এই অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ওয়াশিংটন থেকে কিউবাকে ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবের সাথে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি বড় শর্ত—কিউবাকে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ‘তাৎপর্যপূর্ণ সংস্কার’ করতে হবে। অর্থাৎ, সহায়তার বিনিময়ে শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন চাইছে বাইডেন-ট্রাম্প পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল এই প্রস্তাবকে ‘অমানবিক ব্ল্যাকমেল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির শ্বাসরোধ করছে, অন্যদিকে সহায়তার নামে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে।
আরও পড়ুনঃ বুলডোজারে মাটিতে মিশে গেল গড়িয়ার ক্লক টাওয়ার
অর্থনৈতিকভাবে পর্যটন কিউবার মেরুদণ্ড। কিন্তু জ্বালানি আর বিদ্যুৎ ছাড়া পর্যটন শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে। বড় বড় হোটেলগুলোতে জেনারেটর চালানোর মতো তেল নেই, ফলে বিদেশি পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি দফতরগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল একটি দেশের অবকাঠামোই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকেও এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিটি পরিসংখ্যানই এখানে উদ্বেগজনক—২২ ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট, শূন্য শতাংশ জ্বালানি মজুত এবং মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি। তুমি যদি কিউবার সাধারণ মানুষের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করো, তবে বুঝবে যে আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ আর জ্বালানি ছাড়া একটি জাতির টিকে থাকা কতটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিউবা এখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অন্ধকারই একমাত্র সঙ্গী।


