বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বাজারের থলি হাতে নিলে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করে। যে দ্রব্যটি গত মাসেও একটি নির্দিষ্ট দামে পাওয়া যেত, আজ তার দাম কয়েক টাকা বেশি অথবা প্যাকেটের ওজন আগের চেয়ে বেশ কিছুটা কম। ভারতের ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস (FMCG) বা দ্রুত ব্যবহারযোগ্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপরিশোধিত তেল থেকে শুরু করে পাম তেল, প্যাকেজিংয়ের প্লাস্টিক থেকে শুরু করে লজিস্টিকস—সবকিছুর খরচ যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে সংস্থাগুলোর সামনে দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এই প্রতিবেদনে আমরা খতিয়ে দেখব কীভাবে মুদ্রাস্ফীতির এই ঢেউ ভারতের বাজার এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে।
গত কয়েক মাস ধরে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের ভোগ্যপণ্য বাজারে। পরিসংখ্যান বলছে, এফএমসিজি সংস্থাগুলোর ইনপুট খরচ বা উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ হলো অপরিশোধিত তেলের দামের উর্ধ্বগতি। তেল আমদানির খরচ বাড়ার ফলে লজিস্টিকস এবং পরিবহণ ব্যয় এক ধাক্কায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি বেড়েছে। সাবান বা ডিটারজেন্টের মতো রাসায়নিক ভিত্তিক পণ্যের কাঁচামাল সরাসরি অপরিশোধিত তেলের সাথে যুক্ত, ফলে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার (HUL) বা গোদরেজের মতো সংস্থাগুলো চাপের মুখে পড়েছে।
শুধু তেল নয়, পাম তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিস্কুট, চিপস এবং রান্নার তেলের দামকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ল্যামিনেট এবং প্লাস্টিকের খরচও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, উৎপাদন খরচের এই বাড়তি বোঝা তারা আর নিজেদের ওপর চেপে রাখতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ছে খুচরা বিক্রয় মূল্যের (MRP) ওপর।
তুমি হয়তো লক্ষ্য করেছ, অনেক সময় একটি সাবান বা বিস্কুট প্যাকেটের দাম আগের মতোই ১০ টাকা রয়ে গেছে, কিন্তু প্যাকেটের আকার আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘শ্রীঙ্কফ্লেশন’ (Shrinkflation)। এটি এফএমসিজি সংস্থাগুলোর একটি অত্যন্ত কৌশলী পদক্ষেপ। বিশেষ করে গ্রামীণ ভারতের বাজারে যেখানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত, সেখানে সরাসরি দাম না বাড়িয়ে পণ্যের ওজন বা পরিমাণ (Grammage) কমিয়ে দেওয়া হয়। ব্রিটানিয়া বা পার্লের মতো সংস্থাগুলো এই কৌশলেই তাদের বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ৫ বা ১০ টাকার ‘ম্যাজিক প্রাইস পয়েন্ট’ ধরে রাখতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিস্কুটের ওজন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ডাবর বা পিডিলাইটের মতো সংস্থাগুলো ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি করেছে। পিডিলাইট (যারা ফেভিকল বা ডক্টর ফিক্সিট তৈরি করে) জানিয়েছে যে তাদের প্রধান কাঁচামালের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। একইভাবে নেসলে ইন্ডিয়া তাদের প্রিমিয়াম পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে দাম বাড়িয়ে মার্জিন বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
মুদ্রাস্ফীতির এই ঝাপটা শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ ভারতে বেশি অনুভূত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ দৈনিক মজুরি এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লে এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময় নামী ব্র্যান্ড ছেড়ে স্থানীয় বা সস্তা ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যাকে বলা হয় ‘ডাউন-ট্রেডিং’। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রামীণ বাজারে এফএমসিজি পণ্যের ভলিউম গ্রোথ বা বিক্রির পরিমাণ কিছুটা নিম্নমুখী। শহরাঞ্চলে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বেশি থাকলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের মাসিক বাজেটে কাটছাঁট করতে শুরু করেছে। চাল, ডাল, তেলের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে প্রসাধন সামগ্রী বা বিলাসবহুল পণ্যের খরচ কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ নিজেকে বদলান! ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা; ফিরছে WFH
এই সংকট মোকাবিলায় সংস্থাগুলো কেবল দাম বাড়িয়েই ক্ষান্ত থাকছে না। আইটিসি (ITC) বা টাটা কনজিউমার প্রোডাক্টসের মতো বড় খেলোয়াড়রা এখন তাদের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে। সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে মাঝারিপথ কাটছাঁট করা হচ্ছে যাতে খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। মারিকো বা আদানি উইলমারের মতো সংস্থাগুলো ‘ক্যালিব্রেটেড প্রাইস হাইক’ বা ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর নীতি নিয়েছে। অর্থাৎ একবারে ১০ টাকা না বাড়িয়ে কয়েক মাস অন্তর ২ টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে যাতে ক্রেতার মনে বড় কোনো ধাক্কা না লাগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুদ্রাস্ফীতির হার যদি চলতি অর্থবর্ষের শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে, তবে এফএমসিজি সেক্টরের লাভ বা প্রফিট মার্জিন আরও সংকুচিত হবে। সরকার যদি আমদানি শুল্ক হ্রাস বা জ্বালানি তেলের ওপর কর কমায়, তবেই হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে আপাতত সাধারণ ক্রেতার জন্য স্বস্তির কোনো খবর নেই।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন যাপনের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে। আটা থেকে চিনি, সাবান থেকে শ্যাম্পু—প্রতিটি ছোট জিনিসের জন্য আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক টার্ম নয়, এটি সরাসরি রান্নাঘরের বাজেট এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সংস্থাগুলো তাদের শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা নিশ্চিত করতে দাম বাড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বাজারের এই আগুন কবে শান্ত হবে, তা নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ওপর। ততদিন পর্যন্ত সাশ্রয় এবং হিসাব করে খরচ করাই হয়তো সাধারণ মানুষের একমাত্র হাতিয়ার।


