ডঃ এস মৈত্র, কলকাতাঃ
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যৌনতা বা যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত খোলামেলা আলোচনা এখনও একটি বড় ‘ট্যাবু’ বা সামাজিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা হয়। আর এই গোপনীয়তা ও তথ্যের অভাবের কারণেই তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও তৈরি হয় নানা ধরনের ভুল ধারণা বা ভ্রান্ত বিশ্বাস (Myths)। ইন্টারনেটের ভুয়া তথ্য ও চটকদার প্রচারণার কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হন। পুরুষাঙ্গ বা পেনিস (Penis) সম্পর্কিত এমনই ৬টি প্রচলিত মিথ এবং তার পিছনের চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত সত্য তুলে ধরা হলো:
মিথ-১: ওষুধ বা ব্যায়ামের মাধ্যমে পেনিসের আকার বড় করা সম্ভব
-
সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বাজারে বিক্রীত কোনো ওষুধ, তেল বা ক্রিম খেয়ে বা মেখে পেনিসের দৈর্ঘ্য বাড়ানো সম্ভব নয়—এগুলি মূলত প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম বা টানটান করার পদ্ধতিরও কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ নেই।
-
চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলে: পেনিসের দৈর্ঘ্য স্থায়ীভাবে বাড়ানোর একমাত্র উপায় হলো অস্ত্রোপচার (Surgery) বা কিছু ক্ষেত্রে হরমোন থেরাপি। তবে চিকিৎসকরা সাধারণ ক্ষেত্রে কখনোই এই ধরনের চিকিৎসার পরামর্শ দেন না, যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরুষাঙ্গটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মাইক্রোপেনিস’ (Micropenis) হিসেবে চিহ্নিত হয় (সাধারণত উত্তেজিত অবস্থায় ৩ ইঞ্চির কম এবং শিথিল অবস্থায় ১.৫ ইঞ্চির কম হলে)।
আরও পড়ুনঃ ‘ভয়াবহ’ পর্যায়ে এইডসের সংক্রমণ! সতর্ক হোক আধুনিক জীবন, সতর্ক হোন আপনি
মিথ-২: জুতোর মাপ বা হাতের সাইজের সাথে পেনিসের আকারের সম্পর্ক রয়েছে
-
সত্য: এটি একটি বহুল প্রচলিত কুসংস্কার। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ—যেমন জুতোর মাপ, হাতের আঙুলের দৈর্ঘ্য বা উচ্চতার সঙ্গে পেনিসের আকারের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।
-
নিয়ন্ত্রক উপাদান: পেনিসের আকার মূলত জিনগত (Genetic) কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। গর্ভকালীন বৃদ্ধি ও বয়ঃসন্ধিকালের হরমোনের প্রভাবও এর সঙ্গে যুক্ত।
মিথ-৩: শিথিল ও উত্তেজিত অবস্থায় পেনিসের আকার সমানুপাতিক থাকে
-
সত্য: প্রতিটি মানুষের শারীরিক গঠন আলাদা। অধিকাংশ পুরুষের ক্ষেত্রেই শিথিল (Flaccid) এবং উত্তেজিত (Erect) অবস্থায় আকারের স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়।
-
তবে কারও ক্ষেত্রে যদি শিথিল অবস্থায় আকার ছোট দেখায় কিন্তু উত্তেজিত অবস্থায় স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যে পৌঁছায় (যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘Grower’ নামে পরিচিত), বা কারও ক্ষেত্রে উভয় অবস্থায় আকারের বড় কোনো তফাত না থাকে (যা ‘Shower’ নামে পরিচিত)—উভয় পরিস্থিতিই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
আরও পড়ুনঃ ক্ষেপণাস্ত্র হানার মুখে ১৩ জন ভারতীয় নাবিক, চরম আতঙ্কে ক্রু সদস্যরা
মিথ-৪: বাঁকা পেনিস অস্বাভাবিক বা রোগ ব্যাধি
-
সত্য: পেনিস সোজা হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সামান্য ডানে, বামে বা ওপর-নিচে বাঁকা হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সাধারণ বিষয়।
-
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন: যদি বাঁকা ভাবটি অতিরিক্ত মাত্রায় হয় এবং মিলনের সময় তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি করে, তবে এটি ‘পেরোনিজ ডিজিজ’ (Peyronie’s Disease) হতে পারে। এমন অবস্থায় ইউরোলজিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মিথ-৫: পেনিস দীর্ঘ না হলে সঙ্গীকে তৃপ্ত করা সম্ভব নয়
-
সত্য: যৌন সুখে পেনিসের দৈর্ঘ্যই একমাত্র বা প্রধান নির্ণায়ক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের যৌন তৃপ্তি ও অর্গাজমের জন্য ক্লিটোরিস স্টিমুলেশন (Clitoral Stimulation), সঠিক ফোর-প্লে (Foreplay) এবং মানসিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
-
গড় আকার: চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে পুরুষের পেনিসের গড় আকার শিথিল অবস্থায় প্রায় ৩.৬৬ ইঞ্চি এবং উত্তেজিত অবস্থায় প্রায় ৪.৫৯ থেকে ৫.১ ইঞ্চি। অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের চেয়ে সঠিক সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক খোলামেলা আলোচনাই যৌন জীবনকে সুখী করে তোলে।
মিথ-৬: পেনিসে কোনো হাড় নেই, তাই এটি কখনো ভাঙতে পারে না
-
সত্য: পেনিসে কোনো হাড় বা তরুণাস্থি (Cartilage) না থাকলেও এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ‘ভাঙতে’ পারে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পেনাইল ফ্র্যাকচার’ (Penile Fracture) বলা হয়।
-
কীভাবে হয়: উত্তেজিত অবস্থায় স্পঞ্জি টিস্যুতে রক্ত জমাট বেঁধে থাকে। এই অবস্থায় অতিরিক্ত চাপ বা দুর্ঘটনাবশত তীব্র দুমড়ে-মুচড়ে গেলে রক্তবাহী আবরণী (Tunica Albuginea) ছিঁড়ে যেতে পারে।
-
লক্ষণ: মিলনের সময় হঠাৎ মড়মড় শব্দ হওয়া, তীব্র ব্যথা, দ্রুত উত্তেজনা কমে যাওয়া এবং পেনিস ফুলে নীল বা কালো হয়ে যাওয়া।
-
করণীয়: পেনাইল ফ্র্যাকচার একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি (Medical Emergency)। এমনটা ঘটলে কোনো দেরি না করে অবিলম্বে জরুরি বিভাগে গিয়ে অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা করানো আবশ্যক।
উপসংহার: যৌন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে চটকদার বিজ্ঞাপন বা অপ্রমাণিত উপকথায় কান না দিয়ে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি। কোনো দ্বিধা বা সংশয় থাকলে সবসময় নিবন্ধিত চিকিৎসক বা ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।


