পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ প্রশাসনের অন্দরে এক গভীর ও সংগঠিত দুর্নীতির জাল ছড়িয়ে রয়েছে, যা রাজ্য পুলিশের দীর্ঘদিনের গৌরব ও শৃঙ্খলার ভিতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পুলিশ ওয়েলফেয়ার কমিটির আড়ালে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস এবং বিজিতাশ্ব রাউথের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুলিশের বদলি এবং পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থল বা পোস্টিংকে কার্যত একটি ‘নিলামের বাজারে’ পরিণত করেছিল। অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন এডিজি (এ) অজয় রানাডেকে সুকৌশলে ব্যবহার করে, এই চক্রটি পুলিশ বিভাগে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
আরও পড়ুনঃ বাংলাতে থাকছে কেন্দ্রীয় বাহিনী; রাজ্যের আবেদনে দ্রুত সাড়া
সূত্রের খবর, এই দুর্নীতির একটি সুনির্দিষ্ট ‘রেট-চার্ট’ ছিল। কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর—প্রতিটি পদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। কনস্টেবলদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য ন্যূনতম ১ লক্ষ টাকা, এএসআইদের জন্য ১.৫ লক্ষ টাকা এবং এসআইদের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। এই অনৈতিক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে যারা মাথা নোয়াতে অস্বীকার করেছেন, তাঁদের কপালে জুটেছে চূড়ান্ত হয়রানি। একবার ৩৫০০ জন পুলিশ কর্মীর পছন্দ অনুযায়ী বদলির আবেদন অফিসিয়ালি বাতিল করে দেওয়া হয়! নেপথ্যে কারণ নাকি তাঁদের কাছ থেকে তোলা আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় সেই আবেদন প্রক্রিয়া কৌশলে বাতিল করে দেওয়া হয়। অর্থের বিনিময়ে উত্তরবঙ্গের প্রতিকূল এলাকা থেকে দক্ষিণবঙ্গের নিজের পছন্দের জেলায় ফিরে আসার সুযোগ পেতেন শুধু তারাই, যারা ওয়েলফেয়ার কমিটির চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিলেন।
অভিযোগ এই পুরো দুর্নীতির ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়নের নেপথ্যে সক্রিয় ছিলেন ডিএসপি সদর কৌনজি মিত্র এবং অর্জুন সোমরা। যারা পুলিশ ওয়েলফেয়ার কমিটির প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেন! আগে বদলি নিয়ে ADG নিজে আবেদন শুনতেন। পরে তা বদলে যায়। শোনা যায় অজয় রানাডে এডিজি (এ) হওয়ার পর পুলিশ ওয়েলফেয়ার কমিটি ভবানীভবনে ‘সিআরও’ (CRO) নামে একটি বিশেষ বিভাগ খুলতে বাধ্য করে এবং তার দায়িত্ব দেওয়া হয় অর্জুন সোমকে। এই বিভাগটিই মূলত বদলি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। কেবল বদলি নয়, পুলিশের গাড়ি ভাড়া এবং জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে চরম লুটপাট। বিভিন্ন জেলার এমটিও (MTO)-দের দাবি, ভুয়ো গাড়ির বিল তৈরি করে সরকারি কোষাগারের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছে এই চক্র। এমনকি, ওয়েলফেয়ার কমিটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি টাকায় কেনা জ্বালানি তেলের অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে কৌনজি মিত্রের বিরুদ্ধে। রাউথের মত ওয়েলফেয়ার কমিটির প্রভাবশালী ব্যাক্তিটি নিয়মিত তাঁর কেশিয়ারির বাড়িতে যেতেন পুলিশের গাড়িতে। ভাবুন লক্ষ লক্ষ টাকার তেল পুড়িয়ে সরকারি কোষাগারের অর্থের অপচয় করা হয়েছে। পুলিশ কর্মীরা চাইছেন এই নিয়ে রাজ্য সরকার তদন্ত করুক!
আরও পড়ুনঃ অ্যাকশন ইডি-র, শহর জুড়ে চলছে তল্লাশি অভিযান
সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং ক্ষোভের বিষয় হলো, বিধায়ক অর্জুন সিংয়ের মতো জনপ্রতিনিধিরা কৌনজি মিত্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা সত্ত্বেও অদৃশ্য কোনো শক্তির ইশারায় সমস্ত তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। কৌনজি মিত্রের বিরুদ্ধে অন্তত চারটি গুরুতর অভিযোগ ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছে। এখনো অর্জুন সোমের মতো বিতর্কিত কর্মীরা সরাসরি এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) অজয় রানাডের অফিসে বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন! এমনকি এসআই ত্রিদিবের মতো পুলিশ কর্মীদের পুনরায় ভবানীভবনের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায় যে, হাতে গোনা কয়েকজন উচ্চপদস্থ আইপিএস অফিসারের মদতেই এই চক্রটি আজও অক্ষত অবস্থায় সক্রিয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ওয়েলফেয়ার কমিটির অনৈতিক কাজে মদত জুগিয়েছেন! এদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি উঠেছে!
অসুস্থ বা মানবিক কারণে বদলির আবেদন করা সাধারণ পুলিশ কর্মীদের আর্জি যেখানে দিনের পর দিন উপেক্ষিত থেকেছে, সেখানে অর্থের বিনিময়ে এই সিন্ডিকেট পুলিশ বিভাগে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। রাজ্যের সাধারণ পুলিশ কর্মীদের এখন একটাই দাবি—পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এই সিন্ডিকেটের মুখোশ খুলে দেওয়া হোক। ভবানীভবনের অন্দরে ফাইলবন্দি থাকা এই দুর্নীতির অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দোষী অফিসারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় যে পুলিশ বিভাগ পরিচালিত হয়, তা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘ব্যক্তিগত ব্যবসা’ হতে পারে না। এই অশুভ সিন্ডিকেট ভেঙে পুলিশে প্রকৃত শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবি এখন বাহিনীর প্রতিটি স্তরে তীব্র হচ্ছে।



