বিশেষ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রতিনিধি:
বাঁকুড়া জেলার মেজিয়া থানা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরের এক শান্ত-স্নিগ্ধ গ্রাম কুস্তোর। ঢাকের কাঠি পড়তেই সেই গ্রামের পুরোনো উঠোনে ভেসে আসে ৩৫০ বছরের ইতিহাসের গন্ধ। আজ জমিদার নেই, জমিদারি প্রথাও লুপ্ত—কিন্তু মুখার্জী পরিবারের সাবেকি দুর্গাপুজোয় একবিন্দু ভাঁটা পড়েনি। এক রাজকীয় দানপত্র, এক নতুন জনপদের জন্মগাথা এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পিতার আত্মসম্মানের লড়াই—এই সব নিয়েই আজ ঐতিহ্যমণ্ডিত কুস্তোরের মুখার্জী বাড়ির রাজসিক অথচ বৈষ্ণবীয় আরাধনা।
রানীগঞ্জের রাজার দান ও ‘কুস্তোর’ গ্রামের জন্মগাথা
মুখার্জী পরিবারের ইতিহাস বলছে, সাড়ে তিনশো বছর আগে এই পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ছড়া-বহুলার দাপুটে জমিদার। কথিত আছে, তদানীন্তন রানীগঞ্জের রাজার জরুরি তলবে রানীগঞ্জের রাজবাড়িতে (বর্তমান রাজবাড়ী মোড়) হাজির হন মুখার্জী পরিবারের তৎকালীন কর্তা। সেই সময় রানীমা সখীদের নিয়ে বর্তমান ‘রানিসায়র’ দিঘিতে স্নান সারছিলেন।
রাজা চিন্তিত মুখে জানান, কুস্তোর ও তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে দীর্ঘদিন রাজকোষে রাজস্ব বা খাজনা জমা পড়ছে না। এই প্রশাসনিক সংকট কাটাতে রাজা মুখার্জী পরিবারের পূর্বপুরুষদের ওপর আস্থা রেখে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন—নজর যতদূর যায়, ততখানি জমি তাঁদের দান হিসেবে সঁপে দেওয়া হয়। মুখার্জী পরিবারের সুদক্ষ পরিচালনায় অচিরেই রাজকোষে খাজনা পৌঁছাতে শুরু করে এবং তাঁদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে আজকের ‘কুস্তোর গ্রাম’।
অপমানের উত্তর ও সংকল্প: এক পিতার জেদ থেকে দুর্গাপুজো
কুস্তোর গ্রাম প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর ঘটে সেই মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা। মুখার্জী পরিবারের তৎকালীন জমিদার (শ্রী রামস্বরূপ মুখার্জীর প্রপিতামহ)-এর তিন রূপসী কন্যা পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়ে চরম অপমানের শিকার হন। কান্না ভেজা চোখে মেয়েরা বাড়ি ফিরলে, তা সহ্য করতে পারেননি অহংকারী অথচ স্নেহশীল সেই জমিদার পিতা।
জমিদার কর্তার সেই সংকল্প:
“অন্যের দুয়ারে গিয়ে আমার সন্তান আর অপমানিত হবে না। এবারে পুজো হবে নিজের ভিটেতেই, সগৌরবে।”
সেই সংকল্প ও অভিমান থেকেই সূচনা হয় কুস্তোর মুখার্জী বাড়ির দুর্গাপুজোর, যা আজ ৩৫০ বছর পেরিয়েও একই মর্যাদায় উজ্জ্বল।
আরও পড়ুনঃ ২১৬ বছর ধরে রাজবংশী বধূর রূপে ‘দেবী ঠাকুরানি’; ডুয়ার্সের ঐতিহ্যবাহী আমগুড়ি বসুনিয়া বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস
তিন পরিবারের মেলবন্ধন ও অনন্য আচারের বৈচিত্র্য
পুরাণমতে এটি ‘রাজসিক’ পুজো হিসেবে গণ্য হলেও, আরাধনার ধরণ সম্পূর্ণ বৈষ্ণব ঘরানার। এখানে আড়ম্বরের চেয়ে নিয়মনিষ্ঠা ও ভক্তিভাবই প্রধান।
-
পালি প্রথা: বংশবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে মুখার্জী পরিবারে পালা করে পুজো করার ‘পালি প্রথা’ চালু রয়েছে।
-
তিন পরিবারের সহাবস্থান: ছড়া-বহুলা থেকে আসার সময় দৌহিত্র হিসেবে ব্যানার্জী পরিবার এবং পরবর্তীতে ভট্টাচার্য পরিবারকে সঙ্গে আনা হয়েছিল। আজও এই তিন পরিবারের সমন্বয়েই দেবীর আরাধনা সম্পন্ন হয়।
-
কুবের পাতা ও কুলদেবতা: সপ্তমীর দিন ‘কুবের পাতা’ বা পরিবারের লক্ষ্মী পৌঁছানোর বিশেষ আচার পালিত হয়। এছাড়া মণ্ডপে দেবী দুর্গার পাশাপাশি পরিবারের কুলদেবতা ‘দামোদর চন্দ্র’-কে বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত রেখে পুজো পরিচালনা করা হয়।
জমিদারির জৌলুস অতীত হলেও, শরতের নীল আকাশে আজও যখন কুস্তোরের মুখার্জী বাড়ির পুরোনো ঠাকুরদালানে চণ্ডীপাঠ ও ঢাকের আওয়াজ প্রতিধ্বনি হয়, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়ায় সাড়ে তিনশো বছর আগের সেই সংকল্পের দিনটিতে।


